রবিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ০৪:২৫ পূর্বাহ্ন

কমান্ডেন্ট মানিক চৌধুরীর ৩১তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ কমান্ডেন্ট মানিক চৌধুরী নামে সমধিক পরিচিত এ.কে লতিফুর রহমান চৌধুরী ১৯৩৩ সালে ২০ ডিসেম্বর হবিগঞ্জ জেলায় জন্ম গ্রহন করেন। তিনি স্থানীয় বৃন্দাবন কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক ও বি. এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। লতিফুর রহমান চৌধুরী ১৯৫২ সালে শ্রেণীতে অধ্যায়রত অবস্থায় তদানীন্তন হবিগঞ্জ মহকুমায় ভাষা আন্দোলন সংঘঠিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপুর্ণ ভুমিকা পালন করেন। তিনি ঐতিহাসিক ৬ দফা আন্দোলনসহ বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে সক্রিয় অগ্রগামী নেতা ছিলেন। ভাষা আন্দোলন এবং ৬৯ এর গণ অভ্যুত্থানে সক্রিয় অংশগ্রহন করার জন্য তিনি বহুবার কারাভোগ করেন। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামীলীগের প্রার্থী হিসেবে তদানীন্তন জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালে ২৫ শে মার্চ রাতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক ওয়ারলেসে প্রেরিত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানিক চৌধুরী সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ শুরু করেন। তাঁর নির্বাচনী এলাকায় চা-–শ্রমিকদের নিয়ে তিনি গঠন করেন “তীরন্দাজ বাহিনী”। যা ছিলো সিলেটর প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধ। হবিগঞ্জ সরকারি অস্ত্রগার থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করে তিনি সিলেট শেরপুরÑসাদিপুর যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। সিলেট কারাগার থেকে মুক্ত করেন, আওমীলীগের অসংখ্য নেতাকর্মী। মুক্তিযুদ্ধের চার নম্বর সেক্টরে অসামান্য সাহসিকতার সঙ্গে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য তিনি নিজে গেরিলা ট্রেনিং গ্রহন করেন। পরবর্তীতে হবিগঞ্জÑমৌলবীবাজার ও সিলেটের মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ প্রদান, খাদ্য সংগ্রহ এবং ভারত থেকে অস্ত্র সংগ্রহের ক্ষেত্রে মানিক চৌধুরী গুুরুত্ব ভুমিকা পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধকালিন চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল এম.এ.রব (বীর উত্তম) গেরিলা যোদ্ধা হিসেবে মানিক চৌধুরীর সাহসী ভূমিকার জন্য মুক্তিযুদ্ধকালিন সময়ে তাঁকে “কমান্ডেন্ট” উপাধিতে ভুষিত করেন। উল্লেখ্য মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে মানিক চৌধুরী একমাত্র “সিভিলিয়ান” যিনি সাহস ও বীরত্বের জন্য “কমান্ডেন্ট” উপাধিতে সম্মানিত হন। তিনি ছিলেন কালের এক সাহসী সন্তান। স্বাধীনতার পর কমান্ডেন্ট মানিক চৌধুরী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দেশ গঠনে আত্মনিয়োগ করেন। তিনি আওমীলীগের মনোনয়নে ১৯৭৩ সালে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বঙ্গবন্ধুর আমলে তিনি বাংলাদেশ চাÑবোর্ড এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির কৃষি বিষয়ক সম্পাদক ও বাংলাদেশ কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি মাধপুরে “শ্যামল মাধবপুর ”নামে একাট উদ্ভাবনী উদ্যোগ গ্রহন করেন। কৃষিক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদানে স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে ১৯৭৪ সালে “বঙ্গবন্ধু কৃষি পদক” প্রদান করা হয়। “আমরা বাঙালি” আন্দোলনের প্রবক্তা হিসেবে তিনি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার আন্দোলনে ব্রত হন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু তাঁকে হবিগঞ্জের জেলা গভর্নর হিসেবে নিয়োগ প্রদান করেন। ৭৫ এর ১৫ই আগষ্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার প্রতিবাদে তিনি রাজপথে প্রতিবাদ মিছিল বের করেন। এ কারণে ১৯৭৬ সালের ডিসেম্বরে তাঁকে গ্রেফতার করে দীর্ঘ চার বছর নির্জন কারাবাসে কারারুদ্ধ করে রাখা হয়। রাজবন্দি থাকা কালিন সময়ে শারিরীক এবং মানসিক ভাবে তাঁকে নির্যাতন করা হয়। ৭৫ পরবর্তী, খন্দকার মোস্তাকের মন্ত্রিসভায় মন্ত্রিত্বের প্রস্তাবকে মানিক চৌধুরী প্রত্যাখান করায় তাঁর কারাবাস দীর্ঘতর করা হয়। ব্যক্তি জীবনে কমান্ডেন্ট মানিক চৌধুরী ছিলেন প্রচার বিমুখ এবং সহজ সরল জীবনযাপনে অভ্যস্ত। সাহিত্যচর্চায় তাঁর ছিলো গভীর আগ্রহ। তিনি বই পড়তে খুব পছন্দ করতেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্ত্রসমূহের মধ্যে রয়েছে “গ্রাম বাংলার রাজনীতি, এক বিশ^ সৃষ্টির দিকে” এবং স্বাদীন বাংলার শাসনতান্ত্রিক কাঠামো। ২০০৯ সালে “কমান্ডেন্ট মানিক চৌধুরী সড়ক” নামে বাইপাস সড়কটি আওমীলীগ সরকার এর সড়ক পরিবহণ ও সেতু মন্ত্রনালয় থেকে গ্রেজেট প্রকাশ করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ কমান্ডেন্ট মানিক চৌধুরী-কে স্বাধীনতা পুরস্কার (মরণোত্তর) ২০১৫ প্রদান করা হয়। জননেত্রী শেখ হাসিনার হাত থেকে স্বাধীনতা পদকÑ২০১৫ গ্রহন করেন কমান্ডেন্ট মানিক চৌধুরীর স্ত্রী বেগম রোকেয়া চৌধুরী। ২০১৬ সালে জননেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে, আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরীরর দানকৃত ভুমি হবিগঞ্জের পুরাতন হাসপাতাল সড়কে হবিগঞ্জ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও মানিক চৌধুরী পাঠাগার প্রতিষ্ঠা জন্য ৫ তলা ভবন নির্মন করা হয়। বর্তমানে মানিক চৌধুরী পাঠাগারটি হবিগঞ্জ শহরের সকল বয়সী পাঠকদের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে। সপ্তাহের তিন দিন পাঠাগারটিতে পাঠক সমাগম হয়। এছাড়া ও কমান্ডেন্ট মানিক চৌধুরীর স্বপ্ন পূরণে, তার কনিষ্ট কন্যা আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরীর প্রচেষ্টায় বাহুবলের ¯œানঘাটে গড়ে উঠেছে, বঞ্চিত মানুষের সেবায় “ শোকর গোজার দাতব্য সেবালয়”। এ মহান মুক্তিযোদ্ধা ও নিবেদিত প্রাণ ত্যাগী রাজনীতিবীদ জীবনের শেষ সময়ে আর্থিক অনটনে সুÑচিকিৎসার অভাবে ১৯৯১ সালে ১০ জানুয়ারি ইন্তেকাল করেন। তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাতের জন্য আজ ১০ জানুয়ারি, মানিক চৌধুরী পাঠাগার কতৃক মরহুমের কবর জিয়ারত, দরিদ্র মানুষের মাঝে শীতবস্ত্র ও খাদ্য সামগ্রী বিতরণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া ও হবিগঞ্জ মাস্টার কোয়াটার আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরীরর বাস ভবনে বাদ আসর হতে বাদ এশা পর্যন্ত কোরআন খতম ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে।

এই নিউজটি আপনার ফেসবুকে শেয়ার করুন

© shaistaganjerbani.com | All rights reserved.