শুক্রবার, ১২ এপ্রিল ২০২৪, ১১:৩৫ অপরাহ্ন

গেরিলাযোদ্ধা কমান্ড্যান্ট মানিক চৌধুরীর ৭৯তম জন্মবার্ষিকী আজ

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ  ৫২ এর ভাষা আন্দোলনে হবিগঞ্জ মহকুমায় প্রথম কারাবরণকারী ও মহান মুক্তিযুদ্ধের গেরিলা সাহসী রণযোদ্ধা কমান্ড্যান্ট মানিক চৌধুরীর ৭৯তম জন্মবার্ষিকী। এ উপলক্ষে মানিক চৌধুরী পাঠাগারে এর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বিভিন্ন কর্মসূচি। তার মধ্যে রয়েছে, হবিগঞ্জ শায়েস্তনগর কবরস্থানে মরহুমের কবর জিয়ারত ও তার রুহের মাগফেরাত কামনায় বিভিন্ন গ্রামে দরিদ্রদের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ। এছাড়া, মানিক চৌধুরীর রণাঙ্গনের সহযোদ্ধাদের নিয়ে মানিক চৌধুরী পাঠাগার আলোচনা সভার আয়োজন করেছে। এই দিবসকে কেন্দ্র করে কমান্ডেন্ট মানিক চৌধুরী কন্যা আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরী হবিগঞ্জ জেলার সকল শ্রেণীপেশার মানুষের কাছে তার পিতার জন্য বিশেষ দোয়া কামনা করেছেন। বাবার স্বপ্ন পূরণে সকলের সহায়তা কামনা করেছেন, কেয়া চৌধুরী। ব্যক্তি জীবনে কমান্ডেন্ট মানিক চৌধুরী ছিলেন, দিল-খোলা, হাস্য-উজ্জ্বল, বন্ধুসুলভ পরোপকারী একজন মানুষ। গ্রাম-বাংলার রাজনীতি ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তার রয়েছে, অনেক লেখালেখি বা সাহিত্যকর্ম। রাজনীতির নেশার মাধ্যমে করেছেন জনসেবা। বঙ্গবন্ধুর একনিষ্ঠ সহচর মানিক চৌধুরী বঙ্গবন্ধুর ৬৬ সালের ৬ দফাকে বাসতবায়ন করতে কারাবরণ করেন। মানিক চৌধুরীর পৈতৃক বাড়ির কাচারী ঘরটিতে আওয়ামী তথা ছাত্রলীগের কার্যালয় হিসাবে ব্যবহারিত হতো। সেই কাচারি ঘরটিতে ছাত্রলীগের প্রথম কার্যালয় স্থাপিত হয়। ১৯৭১ সালে মানিক চৌধুরীর বাড়িতেই প্রথম বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে জাতিয় সংগীত পরিবেশন করেন সে-সময়ের ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দরা। এসব কারণে, ১৯৭১ সালে পাকবাহিনীর দল হবিগজ শহরে ডুকে মানিক চৌধুরীর পৈতৃক বাড়িটি আগুন দিয়ে পুরিয়ে ছাই করে ফেলে। মানিক চৌধুরী ভাষা-আন্দোলনের এক অগ্রপথিক ছিলেন। ভাষা আন্দোলনে হবিগঞ্জ মহকুমার সকল শিক্ষা প্রতিষ্টানের ছাত্রদের সংগঠিত করা অপরাধে তাকে কারাবরণ করতে হয়। মুক্তিযুদ্ধে অকুতোভয় বীরমুক্তিযোদ্ধা। প্রতিটি ভূমিকাতেই যিনি ছিলেন অনন্য ও অসাধারণ।
হবিগঞ্জে ১৯৩৩ সালে ২০ ডিসেম্বর জন্ম নেওয়া মানিক চৌধুরী, দ্বিধাহীন চিত্তের এই দেশ প্রেমিককে পরিচিতদের সবাই চেনেন, কমান্ডেন্ট মানিক চৌধুরী নামে। তিনি বাঙালী জাতির স্বাধীনতা ও মুক্তি সংগ্রামের বঙ্গবন্ধুর এক অকুতোভয় আদর্শিক সৈনিক। রাজনৈতিক ভাবে আওয়ামীগকে হবিগঞ্জে তৃণমূলে পৌঁছে দিতে তার ভূমিকা ছিলো অতুলনীয়। বঙ্গবন্ধুকে স্ব-পরিবারে হত্যার প্রতিবাদ করায় তাকে মোস্তাক ও জিয়া অবৈধ সরকার বিভিন্ন সময় বিনা কারণে গ্রেফতার করে। ৭৫ হতে ৭৮ সাল পর্যন্ত কমান্ডেন্ট মানিক চৌধুরী হবিগঞ্জ -সিলেট ও ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে অন্ধকার নির্জন সেলে বন্দি থাকা অবস্থায় তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। ৭৫ পরবর্তী রাজনৈতিক মন্ত্রীত্বের প্রলোভনকে তিনি প্রত্যাখান করে কারাবন্দী জীবনকে বেছে নেন। দেশ ও কালের সীমানা পেরিয়ে তিনি তার প্রতিভার ব্যাপ্তি ঘটিয়েছিলেন মা, মাটি ও মানুষের জন্য। দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হয়ে রাজনীতি, আর রাজনীতির মধ্য দিয়ে সমাজসেবায় রাজনৈতিক শৈল্পিকতায় পূর্ণতা এনেছিলেন, তার গোটা জীবনকে। পরোপকারী মানষিকতা, দৃঢ?চেতা ও সৃজনশীলতার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য তাকে সহজেই সমবয়সি, শিক্ষাগুরু ও হবিগঞ্জের সামাজিক পরিমন্ডলে পরিচিত করে তুলেছিল।
সাংগঠনিক গুনেগুণান্বিত মানবতাবাদী এ দেশপ্রেমিক মানুষটির জীবনের লক্ষ্য স্থির হয়েছিল প্রকৃতগত ভাবেই। মানুষের প্রতি অসীম দরদ তাকে দায়িত্বশীল করে তুলেছিল। ১৯৫২ এর রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই আন্দোলনের মধ্যদিয়ে ১৯৫১-তে মেট্রিক পাশ করা ছাত্র মানিক চৌধুরী-প্রথম মায়ের ভাষা রক্ষায় কারাবরণ করেন। তার ছাত্রজীবনে বানিয়াচং গ্রামে মরনব্যাধী ম্যালেরিয়া মহামারী দেখা দিলে, তিনি তার মা সৈয়দা ফয়জুন্নেসার গহনা বিক্রি করে অসুস্থ পরিবার গুলোর সহায়তার হাত বাড়িয়েছিলেন। বাঙালীর মুক্তি সংগ্রামের প্রতিটি ধাপে, প্রতিটি গণ-আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শিক সৈনিক হিসেবে মানুষের মাঝে বঙ্গবন্ধুর বার্তাকে তিনি পৌঁছে দিয়েছেন।
বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের পরপরই মানিক চৌধুরী তার নির্বাচনী এলাকার (চুনারঘাট, শ্রীমঙ্গল ও বাহুবল) সবগুলো চা বাগানের চা শ্রমিকদের নিয়ে একটি শক্তিশালী তীরন্দাজ বাহিনী গঠন করেন। ২৫ মার্চের পূর্ব পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে তীরন্দাজ বাহিনীকে নিয়ে প্রতিরোধ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পরেন তিনি। ঢাকা-সিলেট সড়কে ব্যারিকেট দিয়ে পাকিস্তানী সেনাদের প্রবেশের সম্ভাবনাকে অসম্ভব করে তোলেন। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষনের, ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ এই নির্দেশনাকে মানিক চৌধুরী তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্যবস্তুতে স্থির করেছিলেন। জনসংযোগ সৃষ্টির মধ্যদিয়ে হবিগঞ্জে প্রতিরোধ যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে পেরেছিলেন। চিরকাল সুন্দরের স্বপ্ন দেখা এই মানুষটি রাজনীতিকে বড় পরিসরে সমাজসেবা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। শিল্পের আঙ্গিনায়, একজন শিল্পী যেমন তার রঙতুলি দিয়ে বিশাল ক্যানভাসে তার চিন্তার বিষয়কে রাঙিয়ে দিয়ে ফুটিয়ে তোলেন, ঠিক একই ভাবে রাজনীতিবিদ তার জীবনকে মানুষের জন্য উৎসর্গ করে মেধা, শ্রম ও সেবা দিয়ে জনগণকে মুগ্ধ করে তোলেন। সত্য-ন্যায় ও সুন্দরের স্বপ্ন দেখা এই মানুষটি। মানুষের সেবায় ব্রত হয়ে গোটা জীবন দিয়ে মানিক চৌধুরী তার রাজনৈতিক আঙ্গিনাকে নানা রঙ্গে ও ফুলে-ফুলে সুবাসিত করেছেন। সুখে-দুখে জনগণের পাশে থেকে দুঃসময়ে সাহসীকতার পরিচয় দিয়ে দিশাহীনদের সদা আলোর পথ দেখিয়েছেন। রাজনৈতিক এই আদর্শিক শিল্পী বিশ্বাস করতেন তার জনগণকে। তৃণমূলের জনগণই ছিল তার রাজনৈতিক জীবন দর্শনের মূল্যবান ক্যানভাস। জনগণের ভালবাসায় তিনি বরাবরই সিক্ত হয়েছেন। জনগণের ভালবাসার পবিত্রতাকে তিনি অক্ষত রেখেছেন শুধু মাত্র ভালবাসা দিয়ে। মুক্তিযুদ্ধে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কমান্ডেন্ট মানিক চৌধুরীর ভূমিকা ছিল বহুবিধ। ভারত থেকে অস্ত্র সংগ্রহ, খাদ্য সংগ্রহ, বিশেষ করে হবিগঞ্জ এবং মৌলভীবাজার থেকে জোয়ানদের মুক্তিফৌজে যোগদানের মাধ্যমে একটি প্রশিক্ষিত মুক্তিফৌজ গঠনে, কমান্ডেন্ট মানিক চৌধুরীর অবদান ছিল অসামান্য। একজন বেসামরিক ব্যক্তি হয়ে সামরিক রণ-কৌশলে মানিক চৌধুরী সিলেটের সর্ববৃহত ও রক্তক্ষয়ী শেরপুর-সাদিপুরের যুদ্ধ পরিচালনা করেন। ১৯৭১ সালে, হবিগঞ্জের সরকারি অস্ত্রাগার হতে ২৭ মার্চ কোন এক সময়ে মানিক চৌধুরীর নেতৃত্বে ৩৩০টি রাইফেল ও ২২০০ গুলি লুট হয়। আর এটিই ছিল শেরপুর-সাদিপুর যুদ্ধে ব্যবহৃত প্রথম অস্ত্র। মানিক চৌধুরীর নয় মাসের যুদ্ধ জীবনে-তিনি নিজের সাথে সঙ্গী করে রেখেছিলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের “স্বাধীনতা ঘোষণা পত্রটি”। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ দিবাগত রাতে, আওয়ামী লীগের অন্যান্য মহোকুমা নেতাদের মত বঙ্গবন্ধু হবিগঞ্জ মহোকুমায় ওয়ার্লেস যোগে এমএনএ মানিক চৌধুরীর কাছে স্বাধীনতার বার্তাটি পাঠিয়েছিলেন। ১৬ ডিসেম্বর বীরের বেশে ফেরা মানিক চৌধুরীর বামপকেটে রাখা ভাজ করা স্বাধীনতার ঘোষণা পত্রটি স¤পর্কে বলেছিলেন, বঙ্গবন্ধুর এই নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা ছিল আমার জীবনের এক মাত্র লক্ষ্য। তাই প্রতিটি মুহুর্তে তার এই বার্তা আমাকে শক্তি জোগিয়েছে। শত্রুর বুকে অস্ত্র ধরতে নির্ভিক রেখেছে। অবিচল রেখেছে যুদ্ধ কৌশল গ্রহণ করতে আমাকে। এই বার্তার শক্তি কতটুকু তা আমি যুদ্ধক্ষেত্রের প্রতি মুহুর্তে অনুভব করেছি। আমি বিশ্বাস করতাম, যদি আমি যুদ্ধক্ষেত্রে শহীদও হতাম। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার এই পত্রটিকে আমি ব্যর্থ হতে দিতাম না। জীবন দিয়ে, আমার শরীরের রক্ত দিয়ে ভিজিয়ে, বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণার মান আমি সমুন্নত রাখতাম। স্বাধীনতার পর মানিক চৌধুরীর কণ্ঠে বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ, দেশপ্রেম ও স্বাধীনতার আকাঙ্খার কথা ফুটে উঠেছে। যতদিন বেঁচে ছিলেন, নানান রাজনৈতিক নির্যাতনের স্বীকার হয়েও দেশের জন্য কাজ করে গেছেন। ১৯৯০ সালের ১৬ ডিসেম্বর তার জীবনের শেষ বক্তব্যে মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, ‘একদিন কম্পন হবে, মুক্তিযোদ্ধাদের মূল্যায়ন হবে, দেশের মাটিতেই যুদ্ধপরাধীদের বিচার হবে’। কেয়া চৌধুরী বলেন, ১৯৯১ সালে একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়েও পিজি হাসপাতালে কোন ওয়ার্ডে আমার আব্বার জন্য একটি সীট আমরা বরাদ্দ করাতে পারিনি। প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে সেদিন চিকিৎসা সম্পন্ন হয়নি। যে কারণে অনেক অভিমান নিয়ে ১০ জানুয়ারি এ পৃথিবী থেকে অকালে চলে যেতে হয়েছে আব্বাকে। আব্বার মৃত্যুর সংবাদটি, সেদিনের ছোট মনে, বড্ড ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল। ২০১৫ সালের ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সন্মাননা স্বাধীনতা পদকে (মরণোত্তর) কমান্ডেন্ট মানিক চৌধুরীকে সন্মানিত করেছেন। একই বছরের নবেম্বরের ১২ তারিখে শীর্ষ যুদ্ধাপরাধী যারা ধনে সম্পদে ক্ষমতার (বিএনপি সরকারের আমলে) চূড়ায় অধিষ্ঠিত ছিল। সেই সাকা চৌধুরী এবং মুজাহিদের ফাঁসির রায় কার্যকর হয়েছিল।
একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে আজ গর্ব করে বলি, আব্বার জীবনের শেষ বক্তব্যের একটি কথাও মিথ্যে হয়নি। কমান্ডেন্ট মানিক চৌধুরী স্মৃতি প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ২০০৯ সালে হবিগঞ্জ বাইপাস সড়ক টি আওয়ামী লীগ সরকার কমান্ড্যান্ট মানিক চৌধুরী সড়ক নামে নামকরণ করে। সর্বশেষ ২০১৬ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে মানিক চৌধুরী পাঠাগার ও হবিগঞ্জ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের জন্য সরকারি ১ কোটি ৪৭ লক্ষ টাকা অর্থায়নে একটি ৫ম তলা বিশিষ্ট বহুতল ভবণ নির্মাণ করা হয়। তিনি ইন্তেকাল করেন, ১০ জানুয়ারি ১৯৯১ সাল।

 

এই নিউজটি আপনার ফেসবুকে শেয়ার করুন

© shaistaganjerbani.com | All rights reserved.