বৃহস্পতিবার, ২৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ১১:২৮ অপরাহ্ন

জগন্নাথপুরের নলজুর নদী দখল-দূষণে বিপন্ন

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ হয়তো সেই দিন আর বেশি দূরে নয়, যেদিন আমাদের অনাগত ভবিষ্যত প্রজন্ম জানবেই না সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে নলজুর নামে একটি নদী ছিল। নদীতে ঢেউ ছিল, স্রোত ছিল। ছিল প্রতিদিন নৌকার হাট। এই নদী এখন খালে পরিণত হয়েছে। জগন্নাথপুর পৌর শহরের প্রাণকেন্দ্রে এই নদী এখন ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়। প্রতিদিন এই দুই সেতুর উপর দিয়ে হাজার হাজার মানুষ চলাচল করেন। সেতুগুলোর দুই পাশে জমা ময়লা-আবর্জনা দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। ফলে অসুস্থ হচ্ছে সাধারণ মানুষ।

জানা গেছে, জগন্নাথপুর পৌরসভার নিজস্ব কোনো জায়গা না থাকায় এখানে ময়লা-আবর্জনা ফেলতে হয়। নদীর প্রাণ হচ্ছে পানি। পানি থাকলে প্রাণ বাঁচে নদীর, পানি না থাকলে নদী মরে যায়। এখন তেমনই মৃত্যুপথযাত্রী নলজুর নদী। নলজুর নদীতে পানি প্রবাহ হ্রাস এবং অব্যাহত চর পড়ায় স্বাভাবিক নৌ-চলাচল ও সেচকার্য ব্যাহত হচ্ছে। বিঘ্নিত হচ্ছে চাষাবাদ। এই নদীতে একসময় চলাচল করতো লঞ্চ-স্টিমার। এখন সেই নদীর বুকে চলাচল করছে গাড়ি, চাষ করা হচ্ছে ফসল। সবচেয়ে দুঃখজনক হচ্ছে, নদীতে সারি সারি পাল তোলা নৌকার ছুটে চলার চিরায়ত দৃশ্যটি হারিয়ে যেতে বসেছে।

অতীতে জগন্নাথপুরে প্রায় ১০টি ছোট-বড় নদী ছিল। কিন্তু এর অনেকগুলোই এখন নাব্যতা সংকটে পড়ে মরে যাওয়ার উপক্রম। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে আসা পলি জমে ভরাট হয়ে যাচ্ছে নদীগুলো। এক সময়ের প্রমত্তা নদীগুলোতে পানি প্রবাহ কমে যাওয়ায় এগুলো সরু খালে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে নদ-নদীগুলো ড্রেজিং না করা ও বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ, পাড় দখল করে ভবন নির্মাণ করার ফলে নদ-নদীগুলোর অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে। সমগ্র হাওর অঞ্চল মরুভূমির রূপ ধারণ করতে চলেছে।

উল্লেখ করা যেতে পারে, ভাটি অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য সারাবছরই স্বাভাবিক নৌ-চলাচলের ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল। নদীগুলোতে পানি প্রবাহ হ্রাস পেয়ে নৌ-চলাচল ব্যাহত হওয়ায় ব্যবসায়ীদের মালামাল পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। এ অবস্থায় জগন্নাথপুরে নদীগুলোর নাব্যতা, পানির ধারণ ক্ষমতা ও সেচ সুবিধা বৃদ্ধি এবং নৌ-যোগাযোগ অব্যাহত রাখার জন্য নদী দখলমুক্ত করা জরুরি।

একসময় জগন্নাথপুর বাজারের পাশে মুক্তিযোদ্ধা ভবনের পাশ দিয়ে নলুয়ার হাওরে পানি দেওয়া হতো। এতে এলাকার কৃষকদের অনেক সুবিধা হতো। ফলে নলজুর নদীটি দখলমুক্ত করার প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করা অতীব জরুরি।

নদী রক্ষায় দেশে আইন রয়েছে। দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায় ও নির্দেশনা আছে। কিন্তু এসব কোনো কাজেই আসছে না। বিভিন্ন সময় পরিকল্পনা নেওয়া হলেও সেগুলো বাস্তবায়ন হয় না। অনেক স্থানে সীমানা চিহ্নিত না থাকায় দখল ও দূষণরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

নলজুর নদী পুনরুদ্ধারে নদীতে পৌরসভার বিষাক্ত বর্জ্য নিঃসরণ, নদীর উপর অবকাঠামো নির্মাণ, নদীতে বিষাক্ত বর্জ্য ফেলা থেকে বিরত থাকতে হবে। পাশাপাশি অবৈধ ড্রেজিং রোধ করা এবং নদী বাঁচাতে আইনের সঠিক প্রয়োগ ও জনসচেতনতা সৃষ্টি এখন সময়ের দাবি।

জগন্নাথপুর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল কাদির বলেন, আমরা ছোটবেলায় দেখেছি খরস্রোতা নলজুর নদী। এখন অবৈধ দখল করে এটিকে খালে পরিণত করা হয়েছে। জগন্নাথপুরবাসীর দাবি, দখলমুক্ত করে পূর্বের নলজুর নদী ফিরিয়ে আনা হোক।

জগন্নাথপুর পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত সচিব শতিষ গোস্বামী বলেন, আমাদের ময়লা ফেলার নিজস্ব কোনো জায়গা নেই। তাই বাজারের আবর্জনাগুলো নদীতে ফেলা হচ্ছে।

জগন্নাথপুর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, আমরা এই নলজুর নদী নিয়ে পরিষদের সভায় কথা বলেছি।

জগন্নাথপুর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা সাজেদুল ইসলাম বলেন, ‘আমি এখানে নতুন এসেছি। নলজুর নদী দখল নিয়ে কথা হয়েছে। এ বিষয়টি আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জানিয়েছি।’

এই নিউজটি আপনার ফেসবুকে শেয়ার করুন

© shaistaganjerbani.com | All rights reserved.