রবিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ০৫:৪২ পূর্বাহ্ন

নরসিংদীর পলাশে নির্মিত হচ্ছে এশিয়ার মহাদেশের সর্ববৃহৎ সার কারখানা ২৬ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ দেশে ইউরিয়া সারের উৎপাদন বাড়াতে নরসিংদীর পলাশে নির্মিত হচ্ছে এশিয়ার মহাদেশের সর্ববৃহৎ সার কারখানা। এটি বর্তমান সরকারের মেগা প্রকল্পের একটি ঘোড়াশাল-পলাশ ইউরিয়া সার কারখানা প্রজেক্ট। যার দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতা হবে ২ হাজার ৮০০ মেট্রিক টন। আর বছরে ৯ লাখ ২৪ হাজার মেট্রিক টন।

জানা যায়, নরসিংদীর পলাশে ঘোড়াশাল ইউরিয়া সার কারখানা স্থাপন করা হয় ১৯৭০ সালে। পরবর্তীতে একই স্থানে পলাশ ইউরিয়া সার কারখানা নামে আরো একটি সার কারখানা স্থাপন করা হয়। শুরুতে এই দুই সার কারখানার উৎপাদন ক্ষমতা ছিল প্রায় ৬ লাখ টন। সক্ষমতা হারিয়ে যা শেষ পর্যন্ত দাঁড়িয়ে ছিল ৪ লাখ টনে।অথচ প্রতিদিন কারখানা দুটিতে পোড়ানো হতো ৬৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। যা বাড়িয়ে দিয়েছে সারের উৎপাদন খরচ। তাই উৎপাদন বাড়াতে এ দুটি সার কারখানা ভেঙে আধুনিক একটি সার কারখানা স্থাপনের কাজ শুরু করেছে সরকার।

বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি কর্পোরেশন (বিসিআইসি) থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছে ২০২০ সালের ১০ মার্চ। শেষ হবে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে। কারখানাটি উৎপাদনে এলে এখান থেকে পাওয়া যাবে বছরে ৯ লাখ ২৪ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া সার। আমদানি নির্ভরতা কমে ৫ ভাগের ১ ভাগে নেমে আসবে। বছরে সাশ্রয় হবে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা। আধুনিক আর পরিবেশ বান্ধব প্রযুক্তিতে নির্মাণ করা হচ্ছে কারখানাটি। যাতে খরচ হবে সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকারের ১৮০০ কোটি টাকা। বাকিটা আসবে নির্মাতা দুই প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ঋণ হিসেবে। কারখানাটি যৌথভাবে নির্মাণ করছে জাপানের মিটসুবিসি হেবি ইন্ডাস্ট্রিজ ও চায়না প্রতিষ্ঠান সিসি সেভেন।

এখন পর্যন্ত নির্মাণ ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ২৪৫.৩৫ মিলিয়ন ইউএস ডলার। ধাপে ধাপে অর্থাৎ আগামী মাসে নির্মাণ ব্যায় আরো বাড়বে। এটি নির্মাণে বিশ্বের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বাংলাদেশে যতো সার কারখানা আছে তাতে কার্বন ডাই-অক্সাইড অর্থাৎ যে গ্যাসটা পরিবেশকে দুষিত করে, সেই গ্যাস আকাশে ছেড়ে দেই।

শুধু সার কারখানা নয়, দেশের সবগুলো পাওয়ার প্লান্টেও এই দূষিত গ্যাসগুলো আকাশে ছেড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু এটিই বাংলাদেশের প্রথম সার কারখানা হবে, যেখানে দূষিত গ্যাসগুলো আকাশে ছেড়ে না দিয়ে ধরে প্রজেক্ট প্রসেজের মধ্যে এনে অতিরিক্ত শতকরা ১০ ভাগ ইউরিয়া সার উৎপাদন করা হবে।

এগুলো সব সম্মিলিতভাবে লেটেস্ট টেকনোলজি ব্যবহার করার প্রেক্ষিতেই প্রতিদিন ২ হাজার ৮০০ মেট্রিক টন ইউরিয়া সার তৈরি করা হবে। আগে যেখানে (ফিল) ইউরিয়া অর্থাৎ ছোট ছোট দানা ব্যবহার করা হতো এখন বড়ো বড়ো দানা ব্যবহার করা হবে। কারণ বড়ো দানার ইউরিয়া সার পরিবেশ বান্ধব। ছোটগুলো এখন আর পৃথিবীতে নেই, কারণ এটা পরিবেশকে দূষিত করে। আর গাছ কিন্তু একসঙ্গে নাইট্রোজেন নিতে পারে না, দানাদার ইউরিয়া সারের সুবিধা হলো জমিতে আস্তে আস্তে নাইট্রোজেন পায় আস্তে আস্তে গ্রহণ করে।

তিন বেলার খাবার যেমন এক সঙ্গে দিলে খাওয়া যায় না, ভাগ ভাগ করে খেতে হয়। অর্থাৎ তিন বেলাই ক্ষুধা লাগবে তিন বেলাই খাবো এভাবে। প্লান্টের খাবার হলো নাইট্রোজেন, যেটাকে স্লো রিলিজ ফার্টিলাইজার বলা হয়। তাতে সে আস্তে আস্তে খেতে পারে, তার পুষ্টিটাও পরিপূর্ণ হয়।

আগে যে (প্রিল) ইউরিয়া ছিল, সেখানে নাইট্রোজেন এক সঙ্গে রিলিজ হতো। তাতে যেটুকু প্রয়োজন হতো আর বাকিটুকু আকাশের দিকে ছেড়ে দেওয়া হতো। দূষিত করে ফেলতো পরিবেশকে। এই সার কারখানাটির মতো এখন থেকে বাংলাদেশের প্রতিটি সার কারখানা পরিবেশ বান্ধব হয়ে গড়ে উঠবে।

এই পজেক্টের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। করোনার কারণে কিছুদিন বিদেশি শ্রমিক কম ছিল এখন করোনা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসায় বিদেশিরা আসতে শুরু করেছেন। দেশি এবং বিদেশি শ্রমিক মিলে একসঙ্গে দ্রুত কাজ করছে। বর্তমানে সরকারকে ইউরিয়া সার আমদানিতে প্রতি বছর ৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়, এটি উৎপাদনে আসলে আর তা দিতে হবে না।বাংলাদেশে বছরে ২৫ লাখ টন ইউরিয়া সারের প্রয়োজন হলেও এটি উৎপাদনে আসলে ২০ লাখ টন পাওয়া যাবে। আর বাকি ৫ লাখ টন বিদেশ থেকে আমদানি করতে হবে। অর্থাৎ ৫ ভাগের ৪ ভাগ বাংলাদেশে উৎপাদন হবে। মোট কথা শতকরা ৮০ ভাগ দেশে উৎপাদন আর শতকরা ২০ ভাগ বিদেশ থেকে আনতে হবে। এখন বাংলাদেশে শতকরা ৪০ ভাগ ইউরিয়া সার উৎপাদন হচ্ছে, ৬০ ভাগ বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। এটি উৎপাদনে আসলে দেশের ৫ ভাগের ৪ ভাগ কৃষকের চাহিদা পূরণ হবে। কর্সংস্থান সৃষ্টি হবে ৯৬৮ জন স্থায়ীসহ ২৬ হাজার মানুষের।

বিসিআইসি আরো জানান, এসব প্রজেক্টগুলো তৈরি করতে প্রধানত নদীর তীরকে বেছে নেওয়া হয়, মেশিনারিজ ইকুয়েভমেন্ট খুব সহজেই আনা যায়। যা সড়ক পথে আনা সহজ নয়। সার উৎপাদনে প্রচুর পরিমাণ পানি ব্যবহার করতে হয়। উৎপাদনের পর সার সরবরাহ করতেও সুবিধা। আর সার উৎপাদনে প্রধানত কাঁচামাল হিসেবে বাতাস ও ন্যাচারাল গ্যাস ব্যবহার করা হয়।

প্রজেক্টটিতে কর্মরত শ্রমিক খানেপুর গ্রামের ওমর আলী বলেন, মহামারি করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণে বেকার হয়ে পড়েছিলাম। খেয়ে না খেয়ে দিন কাটতো। বর্তমানে এখানে কাজ করে যা বেতন পাই তাই দিয়ে বউ, ছেলে-মেয়ে নিয়ে ভালোই আছি। অভাব অনটনের সেই দিনগুলো যেন আর দেখতে না হয়।

কর্মরত অপর একজন ইঞ্জিনিয়ার দিনাজপুরের শাহিনুর ইসলাম বলেন, এই প্রজেক্টের শুরু থেকে কাজ করছি এই এলাকার মানুষজন খুবই ভালো। এখানকার পরিবেশও মনোরম। এখান থেকে উপার্যিত টাকা দিয়ে ছেলে মেয়ের পড়াশোনাসহ পরিবার নিয়ে সুখে আছি। সংসার চালিয়ে মাস শেষে কিছু টাকা আয় করতে পারছি।

বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক ও ঘোড়াশাল পৌরসভার নবনির্বাচিত মেয়র আল মুজাহিদ হোসেন তুষার বলেন, ঘোড়াশাল-পলাশ ইউরিয়া সারকারখানা প্রজেক্ট বর্তমান সরকারের মেগা প্রকল্পের একটি। এটি আমাদের নরসিংদীর পলাশ শিল্পাঞ্চলে নির্মিত হচ্ছে। তাই ঘোড়াশাল পৌরসভার একজন নাগরিক হিসেবে এই অঞ্চলের সবস্তরের জনগণের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। এই মেগা প্রকল্পের কারণে প্রতি বছর বাংলাদেশে যে পরিমাণ ইউরিয়া সার আমদানি হয়, সে ক্ষেত্রে প্রায় ৫ থেকে ৬ লাখ মেট্রিক টন সার কম আমদানি করতে হবে। যা দেশের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক একটি দিক।

বিসিআইসির প্রকৌশলী ও ঘোড়াশাল-পলাশ ইউরিয়া সারকারখানা প্রজেক্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাজিউর রহমান মল্লিক বলেন, সরকারের মেগা প্রকল্পগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ঘোড়াশাল-পলাশ ইউরিয়া সার কারখানা প্রজেক্ট। বিভিন্নভাবে গবেষণা করে ইন্টারন্যাশনাল ওপেন টেন্ডারের মাধ্যমে এই প্রজেক্ট হাতে নেই। ওপেন টেন্ডারের মাধ্যমে জাপানের মিটসুবিসি কোম্পানি সারা বিশ্বে সার কারখানা তৈরি করে। এই জন্য মিটসুবিসিকেই চূড়ান্ত করি।

বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। আর এই খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি কর্পোরেশন। কৃষকদের হাতে যথা সময়ে এবং যথাযথ পরিমাণ সার তুলে দেওয়ার মাধ্যমে। বাংলাদেশে ২৫ লাখ টন ইউরিয়া সারের প্রয়োজন রয়েছে। তার মধ্যে বিসিআইসি প্রায় ১০ লাখ টন উৎপাদন করতে পারে। বাকি ১৫ লাখ টন বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এই প্রজেক্টটার কাজ শেষ হলে সাড়ে ৯ লাখ মেট্রিক টন ইউরিয়া সার উৎপাদন করতে সক্ষম হবো।

এরই মধ্যে বিসিআইসির অন্যান্য সার কারখানা উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এই প্রজেক্টের কাজ শেষ হলে বাংলাদেশ ইউরিয়া সার উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করবে। কৃষি নির্ভর দেশের কৃষকদের ইউরিয়া সারের চাহিদাও মিটে যাবে। বৈদেশিক মুদ্রা বেঁচে যাবে এবং বাংলাদেশ যে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ তা প্রমাণিত হবে।

মহামারি করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণে সারা বিশ্ব যখন থমকে গিয়েছিল এই প্রজেক্টটের কাজ তখনো থেমে থাকেনি। যার কারণে এরই মধ্যে ৪০ ভাগের উপরে কাজ শেষ হয়েছে। ইয়াং কন্ট্রাকটর এমএসআই, সিসিসেভেন তারাও সমানতালে কাজ করছে। সেই জন্যই এই অগ্রগতি। আশা করি যথাসময়ে এবং যথাযথভাবে এই প্রজেক্টটের কাজ শেষ করে উৎপাদনে যেতে পারব।

এই নিউজটি আপনার ফেসবুকে শেয়ার করুন

© shaistaganjerbani.com | All rights reserved.