বুধবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৪, ১০:০০ অপরাহ্ন

নারীদের হাতে তৈরি হচ্ছে কারুকাজ খচিত টুপি ঘুরছে ভাগ্যের চাকা

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ এক জাতীয় মসৃণ সাদা কাপড় আর সুইসুতা দিয়ে গ্রামীণ নারীদের হাতে তৈরি হচ্ছে কারুকাজ খচিত টুপি। বাড়ির উঠানে কিংবা ঘরের মেজেতে বসে যখন তখন সংসারের কাজের ফাঁকে ফাঁকে নারীরা নিপুন হাতে তৈরি করে এই টুপি।

এক একটি টুপি বুনতে সময় লাগে কারো তিন সপ্তাহ কারো চার সপ্তাহ। আর একটি টুপি বুনে পায় ৭০০ থেকে এক হাজার টাকা। নির্দিষ্ট নকশার ওপর নানা রঙের সুতায় তারা যে টুপি বুনে চলেছেন, এই টুপি ওমানে ‘কুপিয়া’ নামে পরিচিত। সাধারণত ‘কেন্দুয়া’র (পাঞ্জাবির মতো পোশাক) সঙ্গে কুপিয়া পরেন সেখানকার পুরুষেরা। এসব টুপি ওমানে পাঠানোর কারণে স্থানীয়ভাবে ওমানি টুপি হিসেবে পরিচিত।

জেলার সদরসহ দক্ষিণাঞ্চলে তথা রামগতি ও কমলনগর এলাকাগুলোতে গেলে চোখে পড়বে নারীদের এমন নিপুন কাজ। তবে কাপড়ের এসব টুপি নারীরা তৈরি করছে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে। তাদের হাতে বুনন করা এ টুপি যাচ্ছে ঢাকা-চট্রগ্রাম ও দেশের বাইরে ওমানসহ বিভিন্ন দেশে। এতে আর্থিকভাবে সাবলম্বী হচ্ছেন কয়েক হাজার নারী।টুপি বুনে আয় করা অর্থ দিয়ে ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার খচর চালানোসহ যোগান দিচ্ছেন সংসারেও। তবে সরকারি বা কোনো দাতা সংস্থার সহযোগীতা পেলে এ পেশায় আরো বহু নারীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব বলে মনে করেন এসব নারী উদ্যোক্তারা।

সদর উপজেলার মিয়ারবেড়ীঁ, পূর্ব চরমনসা ও কমলনগর উপজেলার হাজিরহাট ও চরফলকনের কয়েকটি গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, এসব এলাকার যে বাড়িটির দিকে চোখ যায় সেদিকেই দেখা মেলে সংসারের কাজের ফাঁকে মহিলারা ও লেখা-পড়ার পাশাপাশি স্কুল পড়–য়া মেয়েরা টুপি বুনিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছে। একই চিত্র রামগতি উপজেলার বিভিন্ন এলাকায়ও। অবশ্য তাদের ভাষায় এ টিপুকে ওমানি টুপি বলে থাকেন।

সদর উপজেলার পূর্ব চরমনসা গ্রামের আলমগীর ব্যাপারী বাড়িতে দীর্ঘ দিন থেকে টুপি নকশীর কাজ করছে স্কুল শিক্ষার্থী স্থানীয় সুমী, পান্না, পাখি, নুপুর, জোৎসনাসহ অনেকে। নিদিষ্ট দামে নির্ধারণ করে এসব টুপি কিনে নেয় স্থানীয় বেশ কয়েকজন মহাজন। লেখা-পড়ার পাশাপাশি অভাবের সংসারে নিজেদের উদ্যোগে টুপি বুনিয়ে সাবলম্বী হচ্ছে তারা। তবে যে দাম নির্ধারণ করে তাদের টুপির কাজ দেয়, শেষে সে দাম পায়না বলে অভিযোগ অনেকের।

কমলনগরের হাজিরহাট এলাকার টুপি কারিগর গৃহবধূ ইয়াসমিন ডেইলি-বাংলাদেশকে জানান, জীবনের খুব অল্প বয়স থেকে মায়ের কাছ থেকে শিখে টুপি বুননের কাজ শুরু করেন। তার অধীনে এখন ৫ থেকে ৭০০ নারী টুপি বুননের কাজ করেন। তিনি আলেকজান্ডার বাজারের ব্যবসায়ী ফরিদ ও আশরাফের কাছ থেকে সুতা-কাপড় এনে দেন এসব নারীদের। বুনন শেষে প্রতি মাসে ৪০ থেকে ৫০টি টুপি মহাজনের কাছে বুঝিয়ে দেন তিনি। প্রতিটি টুপি থেকে পান ২০ থেকে ৩০ টাকা।রামগতি পৌরসভার সাহাপাড়া, চরহাছান হোসেন ও পন্ডিত পাড়াতে এ কাজের সঙ্গে জড়িত প্রায় শতাধিক সনাতন ধর্মাবলম্বী নারী। তাদের হাতের কাজ করা টুপির খুবই কদর ওমান দেশটিতে।

একই এলাকার মারজাহান, সুমাইয়া, পারুল ও সুরমা জানান, এ এলাকায় ২০০ নারী টুপি তৈরির কাজ করেন। পার্শ্ববর্তী মিয়ারবেঁড়ী এলাকায় একই ধরনের টুপি বানানোর কাজে যুক্ত আরো প্রায় ২০০ নারী। টুপির নকশা, কাপড় ও সুতা-সবকিছুই সরবরাহ করা হয় তাদের। নকশা অনুযায়ী হাতের কাজ করা একেকটি টুপির জন্য গ্রামের একেকজন নারীকে দেওয়া হয় ৭০০ থেকে হাজার টাকা। তবে হাতের কাজ অতি সুক্ষ্মভাবে করতে হয় বলে একজনের পক্ষে মাসে ১টি বা ২টির বেশি টুপি তৈরি করা সম্ভব হয় না। পারিশ্রমিকের তারতম্য হয় কাজের গুণ ও মান অনুযায়ী। তবে তাদের দাবি সরকারি বা কোনো দাতা সংস্থার সহযোগীতা পেলে এ পেশায় আরো বহু নারীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির পাশাপাশী  আরো প্রচুর পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব।

স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন, টুপি তৈরির কাজে যুক্ত হওয়ায় মেয়েরা সংসারে কিছুটা হলেও আর্থিক সাহায্য করতে পারছেন। প্রত্যন্ত গ্রামে এটা অনেক বড় ব্যাপার। এতে সংসারে নারীর মর্যাদা বাড়ছে। এ ধরনের কাজের ফলে পরিবার, সমাজ এমনকি দেশও উপকৃত হচ্ছে।তারা আরো জানান, রামগতি কমলনগরের যেসব মানুষ নদী ভাঙার শিকার হয়ে ঠাঁই নেয় পরের জায়গায়। এ অঞ্চলের প্রধান সড়কের পাশে প্রায় সব বাড়িতেই টুপি বুননের কাজ করেন নারীরা। এতে গ্রামের দরিদ্র পরিবারের আর্থিক সাহায্য করতে পারছেন  তারা। তবে এসব নারীদের সরকারি ভাবে প্রশিক্ষণসহ সহযোগীতায় এগিয়ে এলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন তারা।

এই নিউজটি আপনার ফেসবুকে শেয়ার করুন

© shaistaganjerbani.com | All rights reserved.