মাধবপুরে উর্বর কৃষিজমির মাটি যাচ্ছে ইটভাটায়
হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুরের বিস্তীর্ণ এলাকায় রাত নামলেই বদলে যায় দৃশ্যপট। নিস্তব্ধ ফসলি জমিতে গর্জে ওঠে ভেকু আর ড্রেজারের শব্দ। কেটে নেওয়া হয় উর্বর কৃষিজমির বুক। আর সেই মাটি ট্রাকভর্তি হয়ে চলে যায় ইটভাটায় ও উন্নয়ন প্রকল্পের নামে। সংঘবদ্ধ এক ভূমিখেকো সিন্ডিকেটের লাগামহীন তাণ্ডবে শত শত একর কৃষিজমি আজ জলাশয়ে রূপ নিচ্ছে। কৃষক হারাচ্ছেন জীবিকার শেষ ভরসা।
এই অবৈধ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে মুখ খুললেই নেমে আসে নিপীড়ন। মামলা, মারধর, এমনকি প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনের নীরবতায় আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে সিন্ডিকেটটি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানেও থামেনি তাদের দৌরাত্ম্য। প্রধান হোতাকে গ্রেপ্তারের পরদিনই জামিনে বেরিয়ে ফের সক্রিয় হওয়ার ঘটনাও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা নিয়ে।
উল্টো বিপাকে পড়েছেন অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া পুলিশ কর্মকর্তা, যিনি এখন পাচ্ছেন হত্যার হুমকি। দীর্ঘদিন ধরে এমন তাণ্ডবে একদিকে যেমন কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে জমির শ্রেণি পরিবর্তনের মাধ্যমে স্থায়ীভাবে পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ছাতিয়াইন রোডসংলগ্ন পলাশ ব্রিক ফিল্ড এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে আলেকপুর গ্রামের দুই ভাই কামরুল মিয়া ও মোশারফের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট অবৈধভাবে মাটি উত্তোলন করছে। এ চক্রের সঙ্গে রয়েছে তাদের ব্যবসায়িক অংশীদার মাধবপুরের সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আলমগীর রানা, নোয়াপাড়া ইউনিয়নের রমজান আলীর ছেলে হবিবুর রহমান নুর, মাছুম মিয়া, সেলিম মিয়াসহ অনেকে। একই সিন্ডিকেট ছাতিয়াইন বাজারসংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকায় নিয়মিত মাটি কাটা ও পরিবহন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। পুকুর খননের নামে কৃষিজমি অতিরিক্ত গভীরভাবে কেটে বিশাল গর্তে পরিণত করা হয়েছে। ফলে এসব কৃষিজমি আবাদ অযোগ্য হয়ে পড়ছে।
স্থানীয়দের দাবি, এসব জমিতে ভবিষ্যতে আর চাষাবাদ সম্ভব হবে না, এমনকি মাছ চাষের সম্ভাবনাও ক্ষীণ। অনেক এলাকায় পানি জমে স্থায়ী জলাশয়ে রূপ নিচ্ছে কৃষিজমি।
জানা গেছে, এ সিন্ডিকেটের একটি সশস্ত্র বাহিনী রয়েছে। কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে তুলে নিয়ে মারধর করা হয়, এমনকি প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়। এলাকাবাসীর দাবি, ভূমি দখল, মাদক ব্যবসা ও সন্ত্রাসী কার্যক্রমের সঙ্গেও এ চক্রের সম্পৃক্ততা রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, এ অবৈধ কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে চললেও প্রশাসনের কার্যকর কোনো হস্তক্ষেপ নেই। স্থানীয়দের ভাষায়, প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই তারা সব করছে। কেউ প্রতিবাদ করলে উল্টো তার বিরুদ্ধেই মামলা হয়।
গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর নোয়াপাড়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসের ভূমি সহকারী কর্মকর্তা আব্দুল মোতাকাব্বির বাদী হয়ে কামরুল মিয়াকে প্রধান আসামি করে বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০-এর ১৫(১) ধারায় মামলা করেন। ওই মামলায় একটি ভেকু ও একটি ডাম্প ট্রাক জব্দ করা হয় (মাধবপুর থানা মামলা নং-৩২)। তবে মামলার পরদিনই কামরুল আদালত থেকে জামিন নিয়ে আবারও মাটি উত্তোলন শুরু করেন। এরপর গত ১৭ জানুয়ারি আরেক মামলায় (মামলা নং-৩৮) গ্রেপ্তার করা হয় কামরুল মিয়াকে। তবে এক দিন জেল খেটে আটকের পরদিনই তিনি জামিনে বের হয়ে ফের একই কাজ শুরু করেন। এর আগে সেনাবাহিনী ও র্যাব অভিযান চালিয়ে একাধিকবার যন্ত্রপাতি জব্দ করলেও থামেনি সিন্ডিকেটের মাটি উত্তোলনের কাজ।
ভূমিখেকো কামরুল মিয়ার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। মাধবপুর থানায় দাঙ্গা ও হত্যাচেষ্টা মামলা ছাড়াও ঢাকার বিমানবন্দর থানায় তার বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা বিচারাধীন।
ফসলি জমি থেকে মাটি উত্তোলন পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ভূমি আইন ও বালুমহাল এবং মাটি ব্যবস্থাপনা আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। স্থানীয়রা বলছেন, উপজেলা প্রশাসন মাঝেমধ্যে নামমাত্র অভিযান পরিচালনা করে। এতে লাভ কিছুই হয় না। উপজেলা প্রশাসনের লোকজন আসতে আসতে সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যায়, আবার তারা গেলে শুরু হয়। ভূমিখেকো সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে জোরালো পদক্ষেপ চান স্থানীয়রা। তা নাহলে মাধবপুরের কৃষিজমি শুধু বিলীনই হবে না, ধীরে ধীরে একটি জনপদই কৃষিশূন্য মরুভূমিতে পরিণত হবে।
জানতে চাইলে সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও মাধবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. মুজিবুর রহমান কালবেলাকে বলেন, ‘আমরা এ বিষয়ে খুবই সক্রিয় (ভাইব্রেন্ট)। কোথাও এ ধরনের ঘটনার অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়ে থাকি। এ ছাড়া এখানে যে ইটের ভাটা রয়েছে, আমরা সেখানেও নজরদারি জোরদার করেছি। কাউকেই কৃষিজমির মাটি কেটে বিক্রি করতে দেওয়া হবে না। সে যেই হোক আর যত ক্ষমতাশালীই হোক, আমরা এ বিষয়ে খুবই স্ট্রিক্ট।’
প্রধান হোতাকে ধরে বিপাকে এসআই নাজমুল: এ চক্রের প্রধান হোতা কামরুল ও সিন্ডিকেট সদস্য মোশাররফ হোসেনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠান মাধবপুর থানার এসআই নাজমুল হোসেন। তবে গ্রেপ্তারের সঙ্গে সঙ্গে তাদের ছাড়াতে থানায় শুরু হয় নানামুখী তদবির-প্রলোভন। তাতে কাজ না হলে এসআই নাজমুলকে দেওয়া হয় হুমকি। এরপর আদালতে পাঠানোর পরদিনই তারা জামিনে বের হয়ে যান। জামিনে বের হয়ে খোদ পুলিশ সদস্যকে দেন হত্যার হুমকি।
জানতে চাইলে মাধবপুর থানার এসআই নাজমুল হোসেন বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও মামলার ভিত্তিতে আমি তাদের আটক করে আদালতে পাঠাই। এরপর তাদের সিন্ডিকেটের লোকজন আমাকে হয়রানি করছে, মিথ্যা তথ্য দিয়ে স্থানীয় কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মীকে বিভ্রান্ত করে তারা আমার মানহানি করছে। এ ছাড়া আমার কথোপকথনের খণ্ডিত অংশ কাটছাঁট করে প্রকাশ করে তারা আমার সম্মানহানি করছে। আমাকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্নভাবে হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে।’

















