সোমবার, ১৭ Jun ২০২৪, ০৫:২২ অপরাহ্ন

মানবাধিকার ও চা শ্রমিকের অধিকার

ড. মোহাম্মদ আবু তাহের

মানবাধিকার সর্ম্পকে আলোচনা করার পূর্বে অধিকার (Right) ও আইনগত অধিকার (Legal Right) সর্ম্পকে কিছুটা আলোকপাত করা দরকার।

অধিকার- আইন বিজ্ঞানের ভাষায় অধিকার হলো মূলতঃ কিছু স্বার্থ (Interest) যেগুলো আইনগত নিয়ম নীতি দ্বারা সংরক্ষিত/ রাষ্ট্রকর্তৃক স্বীকৃত সুযোগ সুবিধাকে অধিকার বলা যায় যেগুলো ব্যাক্তিত্ব বিকাশের জন্য অপরিহার্য।

আইনগত অধিকার- আইনগত অধিকার হলো সেই স্বার্থ যা আইনের নীতিসমূহ দ্বারা স্বীকৃত ও সংরক্ষিত/ যা ভঙ্গ করলে ঘটে যাবে আইনগত ত্রুটি এবং যাকে সম্মান দেখানো হবে একটি আইনগত কর্তব্য ।

মানবাধিকার (Human Rights)- উপরোক্ত অধিকার ও আইনগত অধিকার সমূহ প্রকৃতপক্ষে মানুষেরই অধিকার। কিন্তু মানুষের অধিকার এবং মানবাধিকার এক জিনিস নয়। মানবাধিকার যাকে বলা হয় প্রকৃতির অধিকার তা হলো এমন কিছু সহজাত অধিকার যেগুলো ছাড়া মানুষ সত্যিকার মানুষ হিসেবে জীবন ধারন করতে পারে না। এগুলো কেবলমাত্র মানুষ হবার কারণে তার জন্মগত অধিকার। তাই মানবাধিকার জাতি ধর্ম, বর্ণ, ভাষা, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে পৃথিবীর সকল মানুষের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। মানবাধিকারের সবচেয়ে বড় দুটো বৈশিষ্ট্য হলো এটি সহজাত ও অহস্তান্তরযোগ্য। মানব পরিবারের সকল সদস্যের জন্য সর্বজনীন, সহজাত, অহস্তান্তরযোগ্য এবং অলংঘনীয় অধিকারই হলো মানবাধিকার। মানবাধিকার একজন ব্যাক্তির মর্যাদা ও সম্মানের সাথে জড়িত একটি বিষয় যা মনুষ্য সমাজের নৈতিক মানদন্ডকে প্রকাশ করে। মানবাধিকারকে সমুন্নত রাখার দায়িত্ব ব্যক্তি, সমাজ এবং বিশ্বব্যাপি । যেহেতু বিশ্বসমাজের একেকটি অঙ্গ হলো একেকটি রাষ্ট্র সেহেতু প্রকৃতপক্ষে এই মহান দায়িত্বটি অর্পিত হয় রাষ্ট্রের উপর।

মানবাধিকার হলো ব্যক্তির মানবসত্তা নিয়ে বেচেঁ থাকার অধিকার। মানুষের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার সমূহ নির্বিঘ্নে ভোগ করার অধিকার হলো মানবাধিকার। ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত হয় সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষনা (UDHR) যাকে আর্ন্তজাতিক মানবাধিকার নামে অভিহিত করা হয়। মানুষের সব ধরনের মৌলিক অধিকার মানবাধিকার ঘোষনায় সংরক্ষিত হয়েছে। মানবাধিকার রক্ষায় সরকার ও রাষ্টের আইনি সংস্থাগুলো ভূমিকা যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি সচেতন নাগরিক সমাজের ভূমিকা ও অনস্বীকার্য।
সরকার, বিচার বিভাগ, পুলিশ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, মানবাধিকার সংগঠনসমূহ ব্যক্তি ও নাগরিক সমাজের সমন্বয়েই মানবাধিকার পরিস্থিতির প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব।

মানবাধিকার হচ্ছে যে কোন সরকারের সাফল্য ও ব্যর্থতার অন্যতম নিরিখ।

আমাদের সমাজে, পরিবারে ও বিভিন্ন-প্রতিষ্টানে নানাভাবে অবিচার ও বৈষ্যমের ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটেই চলেছে। সবক্ষেত্রেই মানবাধিকার লঙ্ঘন রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন যদি সরকার সে পথ রূদ্ধ না করে। দেশে মানবাধিকার যদি সংরক্ষিত না থাকে তাহলে আইনের শাসন, সুশাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। আইন যদি সবার ক্ষেত্রে সমভাবে প্রযোজ্য হয় তাহলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাও অহরহ ঘটবে না। নারীর প্রতি মানবিক আচরন, সহিংসতা, গণধর্ষন, ধর্ষিতাকে খুন, শিশুহত্যা, শিশু নির্যাতন ঘটেই চলেছে। এগুলো বন্ধ না করতে পারলে সামাজ ব্যবস্থাই ভেঙ্গে পড়বে। মানবাধিকার রক্ষা করতে হলে দেশে আইনের শাসন প্রয়োজন। রাষ্ট্রকে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কঠোর হতে হবে। যাতে নারী নির্যাতনকারীরা, সব ধরনের জঘন্য অপরাধীরা মনে করতে না পারে আইন তার কাছে কোনো বিষয় নয়।
একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক দেশে গণতন্ত্র নিশ্চিত করতে হলে মানবাধিকার ও আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে সর্বাগ্রে। আমাদের দেশ অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, অর্থনৈতিক উন্নয়নকে টেকসই করতে হলে মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটানো দরকার।
সংবিধানের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য হবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে শোষনমুক্ত সমাজের প্রতিষ্টা, যেখানে সব নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক সাম্য ও সুবিচার নিশ্চত করবে।
সংবিধানের ১১ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে প্রজাতন্ত্র হইবে একটি গণতন্ত্র, যেখানে মৌলিক মানবাধিকার এবং স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকিবে মানবসত্বার মর্যাদা ও মূল্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত হইবে। সংবিধানের ৩৫(৫) নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে কোনো ব্যক্তিকে যন্ত্রনা দেওয়া যাইবে না, কিংবা নিষ্ঠুর, অমানবিক বা লাঞ্ছনাকর দন্ড দেওয়া যাইবে না, কিংবা কারো সঙ্গে অনুরূপ ব্যবহার করা যাইবে না।

দারিদ্র মানবাধিকার লঙ্ঘনের অন্যতম কারণ। দারিদ্র শুধু মানবাধিকার হরণ করে না বিশ্বশান্তিকেও বিঘ্নিত করে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন বহু আগেই বলেছেন দারিদ্রই সন্ত্রাসের মতো মানবতা বিরোধী অপকর্মের জন্ম দিয়ে থাকে। দারিদ্র দূরীকরণ ছাড়া বিশ্ব শান্তিও প্রতিষ্টা করা সম্ভব নয়। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন “ ভোগের পেয়ালা উপচায়ে পড়ে তব হাতে, তৃষ্ণা তোরের হিস্যা আছে ও পেয়ালাতে”। মানবাধিকারের ধারনা অনুসারে প্রতিটি মানুষের অধিকার রয়েছে জীবন ধারনের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার নিশ্চয়তা পাওয়ার, কিন্তু একজন অতি দরিদ্র মানুষের পক্ষে ইহা নিশ্চিত করা অসম্ভব। দারিদ্র মানেই হচ্ছে নিজের মৌলিক অধিকারগুলো পূরণে অক্ষমতা। সুতরাং দারিদ্র ও মানবাধিকার সর্ম্পক অবিচ্ছেদ্য। দীর্ঘদিনের আর্থিক ও সামাজিক বঞ্চনা থেকে দারিদ্রের উৎপত্তি। এ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে হলে শুধুমাত্র রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন হলেই হবে না। সকল মানুষেরই দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন দরকার।

আয়ারল্যান্ডের সাবেক প্রেসিডেন্ট ও জাতীয় মানবাধিকার বিষয়ক কমিশনের হাইকমিশনার মেরী রবিনসন্স বলেছিলেন পৃথিবীর সবচেয়ে মারাত্মক মানবাধিকার লঙ্ঘন হলো চরম দারিদ্র। বাংলাদেশের এখনো লক্ষ লক্ষ মানুষ দরিদ্র সীমার নিচে বসবাস করে। দেশের দারিদ্র কমিয়ে আনতে হলে, মাথাপিছু আয় বাড়াতে হলে বাংলাদেশকে উন্নত রাষ্ট্রের কাছাকাছি নিয়ে যেতে হলে গ্রামীন শিক্ষা, স্বাস্হ্য ও বাসস্থানহীন মানুষের বাসস্থানের ব্যবস্থার অগ্রাধিকার দিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে। তা না হলে সামগ্রিকভাবে জনগনের অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন সম্ভব নয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বলেছেন “ আমার নিজস্ব একটা দর্শন রয়েছে; যার লক্ষ্য হচ্ছে দেশের সিংহভাগ গ্রামীন দরিদ্র মানুষ এবং ভূমিহীন প্রান্তিক জনগোষ্টির উন্নয়ন”। এ কথাগুলো দেশের সকল মানুষেরই মনের কথা বলে মনে করি। দেশের মানুষ এর সফল বাস্তবায়ন দেখতে চায়।

বাংলাদেশ এগিয়ে চলছে শিক্ষা, স্বাস্হ্য, দারিদ্র বিমোচন ও সামাজিক উন্নয়ন খাতে। নারীর ক্ষমতায়ন, প্রবাসীদের অর্থ প্রেরণ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের অভূতপূর্ব উন্নয়ন সবকিছুতেই এদেশের মানুষের সৃজনশীলতার প্রমাণ বহন করে। এদেশের কৃষক, শ্রমিক ও মেহনতী মানুষ একটু সুযোগ পেলেই নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন করতে পারে। বাংলাদেশ এখন অনেক দেশের জন্য অনুকরনীয় দেশ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে যেভাবে নৃশংস ও পৈশাচিক কায়দায় খুনের ঘটনা বেড়ে যাচ্ছে, যেভাবে প্রতিদিন বিভিন্নভাবে বিভিন্ন জায়গায় মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা ঘটে চলেছে, যেভাবে নারী শিশুদের নৃশংস নির্যাতন ও খুন করা হচ্ছে, এতে কিছুসংখ্যক মানবরূপী জানোয়ারদের কারণে আমাদের দেশের বড় বড় অর্জন যেন ম্লান হয়ে যাচ্ছে। বিপন্ন হচ্ছে আমাদের মূল্যবোধ ও বিবেকবোধ। সামাজিক আন্দোলন, মানবাধিকার রক্ষা আন্দোলন ও আইনের শাসন প্রতিষ্টার মাধ্যমে এসমস্ত জঘন্য অপরাধীদের নির্মূল করা সম্ভব। বাংলাদেশের সংবিধানে বলা হয়েছে প্রজাতন্ত্রের মূল লক্ষ্য হবে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত করা। একটি রাষ্ট্র কতটা উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হলো সেটি দিয়ে রাষ্ট্রের মহত্ব পরিমাপ হতে পারে না। একটি রাষ্ট্রের মর্যাদা পরিমাপ করা হয় রাষ্ট্রে কতটা আইনের শাসন আছে, নাগরিক অধিকার ও মানবাধিকার কতটা সুরক্ষিত। সেখানে সবচেয়ে দূর্বল মানুষটি কতটা সুবিচার পায় তা দিয়ে। মানবাধিকার নিশ্চিতকরনে ন্যায়বিচারের বিকল্প নেই। যে কারণে ইসলামে ন্যায়বিচারের ধারণাকে উৎসাহিত করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনের সুরা নিসার ১৩৫ নং আয়াতে এরশাদ করা হয়েছে, হে মুমিনগণ তোমরা ন্যায় বিচারে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত থাকবে আল্লাহর স্বাক্ষিসরূপ; যদিও ইহা তোমাদের নিজেদের অথবা পিতামাতা এবং আত্মীয়স্বজনদের বিরুদ্ধেও হয়। ন্যায়বিচার প্রতিষ্টা করার জন্য পবিত্র কোরআন মজিদে অত্যন্ত কঠোরভাবে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। রাষ্ট্রের কাছে মানুষের প্রত্যাশা ন্যায় বিচার পাওয়া।

সিলেট জেলায় ১৬ টি চা বাগান রয়েছে। মৌলভীবাজার জেলা চা বাগান অধ্যুষিত । এই জেলায় আছে ৯৬ টি চা বাগান এবং চা শ্রমিকরা বিভিন্ন ভাবে অধিকার বঞ্চিত। এ জেলায় নিয়মিত চা শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৬৫ হাজার, অনিয়মিত প্রায় ১৩ হাজার। চা শিল্প বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্প। জাতীয় অর্থনীতিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বাংলাদেশের চা পৃথীবীর ২৫ টি দেশে রপ্তানি করা হয়। এই চা উৎপাদনের সাথে জড়িত চা শ্রমিকরা, সকল নাগরিক সুবিধা ভোগের অধিকার প্রাপ্য হলেও তারা পারিবারিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে বৈষ্যমের শিকার। তাদের প্রতি সদয় আচরণ তাদের ন্যায় সঙ্গত অধিকার প্রতিষ্টায় সচেষ্ট হওয়া পরিবার, সমাজ, রাষ্ট, মানবাধিকার সংগঠনসহ সকলের দায়িত্ত্ব।

১৮৩৯ সালে যখন ভারতে বাণিজ্যিকভাবে চা চাষ শুরু হয়, তখন থেকেই চা-শ্রমিকদের সিংহভাগকে অন্য জায়গা থেকে নিয়ে আসা হয়। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে কুলি বলে পরিচিত এসব শ্রমিকেরা দাসত্বের জীবন যাপন করতেন।
তারাও স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক এবং দেশের যেকোনো স্থানে বাস করার অধিকার তাদেরও রয়েছে। কিন্তু, যে অবস্থার মধ্যে তারা আটকে গেছে, তাতে চা-বাগানেই তাদের জীবন পার করতে হচ্ছে। সেখানে নেই তাদের নিজস্ব জমি।
আমরা যদি চা-বাগানে শ্রম আইন ও শ্রম বিধিমালা এর লঙ্ঘন দেখি, তাহলে তালিকা আর ও দীর্ঘ। প্রথমত চা শ্রমিকদের কোনো নিয়োগপত্র দেওয়া হয় না। শ্রম আইনে বলা আছে, কোনো মালিক নিয়োগপত্র প্রদান না করিয়া কোনো শ্রমিককে নিয়োগ করিতে পারিবেন না এবং নিয়োজিত প্রত্যেক শ্রমিককে ছবিসহ পরিচয়পত্র প্রদান করিতে হইবে। কিন্তু চা বাগানের কোনো শ্রমিকই মালিক পক্ষের কাছ থেকে নিয়োগপত্র পাননি।

শ্রম আইন ও ২০১৫ সালের শ্রম বিধিমালা অনুযায়ী শ্রমিকদের আর ও কিছু উল্লেখযোগ্য সুবিধা দেওয়ার কথা থাকলেও সেগুলো থেকে বঞ্চিত চা-শ্রমিকরা। যেমনঃ কর্মক্ষেত্রে টয়লেট ও প্রক্ষালন সুবিধা। যেখানে চা শ্রমিকরা চা পাতা তোলার কাজ করেন এবং যেখানে চা পাতা তোলা শ্রমিকদের ৯০ শতাংশই নারী, সেখানে না আছে টয়লেট, না আছে প্রক্ষালন কক্ষ। তা ছাড়া খাবার পানির সরবরাহও সবসময় পর্যাপ্ত থাকে না-বাস্তব অবস্থা এমনই বলে জানা গেছে।

শ্রম আইনের ৩২ ধারা মোতাবেক বাসস্থান হতে উচ্ছেদ বিষয়ে বলা হয়েছে, “কোনো শ্রমিকের চাকুরী অবসান হলে তা যে কোনো প্রকারেই হোক না কেন, তিনি তার চাকুরি অবসানের ৬০ দিনের মধ্যে মালিক কর্তৃক তাকে বরাদ্দকৃত বাসস্থান ছেড়ে দিবেন। চা শ্রমিকদের বাগানের বাইরে থাকার কোনো স্থান নেই। এর ফলে সে তার ১৫০ বছরের ও বেশি সময় ধরে বংশপরম্পরায় বসবাস করা বসতভিটা হারাবে। চা শ্রমিকদের জন্য এটি একটি নাজুক পরিস্থিতি।

শ্রম আইনের ৯৫ ধারা অনুযায়ী প্রতিটি চা বাগানে শ্রমিকদের এবং তাদের সন্তানদের জন্য বিধি দ্বারা নির্ধারিত পন্থায় উপযুক্ত চিকিৎসা কেন্দ্র প্রতিষ্টা করার বিধান থাকলেও অনেক চা বাগানে নূন্যতম স্বাস্থ্যসেবা নেই। যেসব বাগানে ডিসপেনসারী রয়েছে, সেখানে সাধারন ওষুধ ছাড়া জীবন রক্ষাকারী কোনো ওষুধই মেলে না। বেশিরভাগ বাগানে খন্ডকালিন চিকিৎসক, ওষুধ, উন্নত চিকিৎসা নেই। এমনকি কোনো কোনো বাগানে অ্যাম্বুলেন্স বা সাধারণ গাড়ীর ব্যবস্থা নেই। ফলে জরুরী পরিস্থিতিতে চিকিৎসার জন্য বাগানের বাইরের কোনো হাসপাতালে যাওয়া সম্ভব হয় না।

সম্প্রতি মৌলভীবাজার জেলাসহ সারাদেশে মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে চা শ্রমিকরা কর্মবিরতি পালন করেছে। দৈনিক মজুরি ১২০ থেকে বাড়িয়ে ৩০০ টাকা করার দাবিতে কর্মবিরতি পালন করেছে দেশের চা শ্রমিকরা। চা শ্রমিক নেতাদের কাছ থেকে জানা গেছে সাধারণত দুই বছর পরপর চা শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি হওয়ার কথা সর্বশেষ ২০১৯ সালে সাক্ষরিত চুক্তির মেয়াদ ২০২০ সালের ৩১ শে ডিসেম্বর শেষ হয়। দেশের বর্তমান পরিস্থিতি ও দ্রব্যমূল্যের উর্দ্ধগতির কারণে চা শ্রমিকদের দৈনিক ১২০ টাকা মজুরি হিসেবে জীবন ধারন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। শ্রমিক নেতারা বলছেন, এটাকায় সংসার চলে না। এজন্য তারা দৈনিক মজুরি নূন্যতম ৩০০ টাকা করার দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে যাচ্ছেন। মজুরি বোর্ড থেকে শুরু করে মালিক পক্ষের সঙ্গে বারবার বৈঠক করেও এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত আসে নি। যার কারণে ধর্মঘটের মতো কর্মসূচিতে যেতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। নিঃসন্দেহে বিষয়টি মানবিক। বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানী তেলের দাম বৃদ্ধিতে দেশের সব শ্রেণি পেশার মানুষের মধ্যে প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। চার ধরণের জ্বালানী তেলের মধ্যে পেট্রোল ও অকটেনের ব্যবহার করে ধনী শ্রেনীর মানুষ। ডিজেলের ব্যবহার হয় সর্বত্র যা সবধরণের পন্য ও সেবায় প্রভাব ফেলে। কেরোসিন ব্যবহার করেন নিম্ন শ্রেনীর মানুষ। সামগ্রিক অর্থনীতিতে অতিরিক্ত মূল্যস্ফীতির কারণে চা শ্রমিকরাও দিশেহারা হয়েছে। বাস্তব অবস্থা বিবেচনায় সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মানবিক দৃষ্টি প্রত্যাশা করি। সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরী ১৭০ টাকা নির্ধারণ হওয়ায় তারা কাজে যোগদান করেছেন।

অবহেলিত ও অনগ্রসর চা শ্রমিক জনগোষ্ঠির মৌলিক অধিকার সংরক্ষন, তাদের সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণ, পারিবারিক ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে সরকার সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমে যাওয়ায় চা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন কার্যক্রম গ্রহন করেছে। প্রকৃত দুঃস্থ ও গরীব চা শ্রমিক হতে নির্বাচন করে চা শ্রমিক পরিবারকে ৫০০০ টাকা করে বছরে এককালীন অর্থসহায়তা প্রদান করারও সিদ্ধান্ত আছে বলে জানা গেছে।

ড. মোহাম্মদ আবু তাহের
লেখক ও গবেষক

এই নিউজটি আপনার ফেসবুকে শেয়ার করুন

© shaistaganjerbani.com | All rights reserved.