সোমবার, ১৭ Jun ২০২৪, ০১:১৯ অপরাহ্ন

লক্ষ্মীপুরের বছর ঘুরলেই ভাঙে ঘর, বাড়ে কষ্ট

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ বছর ঘুরলেই প্রতি বর্ষায় ভাঙে ঘরবাড়ি। সর্বনাশা মেঘনায় বিলীন হয় হাজারো মানুষের স্বপ্ন। বর্ষা এলে ভাঙনের কবল থেকে বাঁচতে কেউ ঘর নিয়ে সরে যান আবার কেউ রাস্তার ধারে বসতি গড়েন। দুঃখ-কষ্টে এভাবেই দিন কাটে লক্ষ্মীপুরের রামগতি-কমলনগরের মেঘনার পাড়ের মানুষদের।

জানা গেছে, ১৯৭৫ সালে প্রথমে বেড়িবাঁধ নির্মিত হয়। ভাঙন কিছুটা কমলেও কিন্তু বন্ধ হয়নি। প্রায় ৩০ বছর ধরে ক্রমান্বয়ে এ ভাঙন দেখা দেয়। ১৯৯০ সাল থেকে আরো তীব্র গতিতে ভাঙতে থাকে কমলনগর ও রামগতি। এরপর গত ১০ বছরে প্রায় ১০ গুণ ভাঙনের কবলে পড়ে দুটি উপজেলা। নতুন করে যোগ হয়েছে মেঘনার জোয়ার। ফলে তীব্র ভাঙনে জেলার কমলনগর ও রামগতি উপজেলার কয়েক লাখ একর ফসলি জমি, হাজারো ঘর-বাড়ি, স্কুল, মসজিদ-মাদরাসা বিলিন হয়ে গেছে। বিলিন হয়েছে সরকারি-বেসরকারি শত শত স্থাপনা। ভিটেমাটি হারিয়ে বাস্তুহারা ও নিঃস্ব হয়েছেন অনেকে।ঘরবাড়ি হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়া মানুষগুলোর আহাজারি আর বুকফাটা কান্নায় নদীর স্রোত যেন আরো ঢেউ নামক ফনা তোলে। আর গিলে খাচ্ছে বসতভিটা। কয়েক যুগ ধরে লক্ষ্মীপুরের কমলনগর ও রামগতি উপজেলার বিস্তীর্ণ জনপদ একে একে গিলে খাচ্ছে রাক্ষুসে মেঘনা নদী।

কমলনগর উপজেলার ভাঙনকবলিত লুধুয়া বাজার এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, ভিটেমাটি ছাড়া হয়ে চলে যাওয়ার এমন একাধিক করুণ চিত্র। আপন ভিটার পুরনো বসতঘর আর পরিবার-পরিজন নিয়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছে এখানকার কয়েকটি বাড়ির একাধিক পরিবার।

এখানে লুধুয়া বাজারে উত্তর পাশে নুরুজ্জামানের বাড়ি। এ বাড়ি থেকে মাত্র কয়েক গজ দূরেই মেঘনা নদী। যেকোনো সময় মেঘনা খাবে আবুল খায়েরের বসতভিটা। তাই ষাট বছরের পুরনো বাপ-দাদার ভিটেমাটি ছেড়ে চলে যাচ্ছেন নতুন বসতিতে। হয়তো দুদিন পর এখানে এসে দেখবেন অথৈ জলরাশি আর ধেয়ে আসা স্রোত। তাই শৈশব, কৈশোর, যৌবনের সব স্মৃতি বুকের বেদনায় সিক্ত করে চোখের জলে মেঘনার বুকে ঢেলে স্বজনদের নিয়ে চলে যাচ্ছেন তিনি।আবুল খায়ের জানান, ১২ পরিবারের এ বাড়ির নাম জয়নাল আবেদীন মিঝি বাড়ি। প্রায় ৬০ বছরের পুরনো বাড়ি এটি। শতাধিক লোকের বসবাস ছিল। এখন দুটি ঘর ছাড়া সব ভেঙে অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছেন বাসিন্দারা।

এ বাড়ির ৮৩ বছর বয়সী নুরুজ্জামান ভাঙা আর জড়ানো কণ্ঠে বলেন, বাড়ির বাসিন্দাদের মধ্যে যাদের সামর্থ্য আছে তারা হয়তো দূরে কোথাও জমি কিনে আবার নতুন ঘর বাঁধবেন। আর যাদের সামর্থ্য নেই তারা ছিন্নমূল হিসেবে থাকবেন সরকারি বেড়িবাঁধের কোলে। একই বাজারের দক্ষিণ পাশে তাদের আরেক প্রতিবেশী আব্দুর রশিদেরও একই পরিণতি।

আড়াই একর জমিজুড়ে বসতবাড়ি, বাগান, পুকুর ও ফসলি ক্ষেত ছিল আব্দুর রশিদের। গত ২০ বছরের ব্যবধানে সর্বনাশা মেঘনা তাকে ভূমিহীন বানিয়ে নিঃস্ব করে দিয়েছে। পাঁচবার ভাঙনের কবলে পড়েছেন তিনি। এখন আর তার নিজের কোনো জমি নেই। তাই পরিবার-পরিজন নিয়ে তিনি এখন ভাড়া বাসায় উঠতে যাচ্ছেনস্থানীয়দের হিসাবে, এ পর্যন্ত দুই উপজেলার অর্ধশত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ২৮টি বাজারসহ বিস্তীর্ণ জনপদ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙনের কবলে বাস্তুহারা হয়েছেন প্রায় ৫০ হাজার মানুষ। এছাড়া বর্তমানে হুমকির মুখে কমলনগর উপজেলা কার্যালয়, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ সরকারি বিভিন্ন স্থাপনা। ভাঙনের কবলে রয়েছে স্থানীয় হাজিরহাট, করইতলা বাজার, চরলরেঞ্চ, চরফলকন, লুধুয়াসহ আরো ১০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

১৯৯৫ থেকে মেঘনা নদীর ভাঙন শুরু হয়। এ পর্যন্ত কমলনগরের চরফলকন ইউনিয়নের প্রায় ১০-১২ কিলোমিটার এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ২০০৮ সাল থেকে ভাঙন পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ রূপ ধারণ করে।

চর ফলকন ইউপি চেয়ারম্যান মোশারফ হোসেন বাঘা বলেন, আমাদের বাড়িটিও নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। অনেক জমিজমা ছিল। তবে এখন কোনো স্মৃতিচিহ্ন নেই। প্রতিদিনই ভাঙছে আর গৃহহীন মানুষের সংখ্যা বাড়ছে।এদিকে, নদী ভাঙন রোধে ভিটেমাটি রক্ষার দাবিতে বিভিন্ন সময় সভা-সেমিনার মানববন্ধনসহ আন্দোলন করছে রামগতি-কমলনগর বাঁচাও মঞ্চ। সংগঠনটির আহবায়ক সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী আব্দুস সাত্তার পলোয়ান বলেন, নদীর বাঁধ রক্ষার দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করেছি। হামলার শিকার হয়েছি। অবশেষে নদী তীর রক্ষায় তিন হাজার ১শ’ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে। আমরা চাই নদীর তীর রক্ষা বাঁধের কাজ আগামী বর্ষার আগে করা হোক।

স্থানীয় এমপি মেজর (অবসর) আব্দুল মান্নান বলেন, সরকারিভাবে বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প পাশ হয়েছে। চলতি বছরের মে মাসে তিন হাজার ১শ’ কোট টাকা ব্যয়ে কমলনগর-রামগতি নদীর তীর রক্ষা প্রকল্প একনেকে অনুমোদন দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এই নিউজটি আপনার ফেসবুকে শেয়ার করুন

© shaistaganjerbani.com | All rights reserved.