সোমবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ০৬:২৮ অপরাহ্ন

লক্ষ্মীপুরে নারকেলের ছোবড়ার বেশ কদর।ছোবড়ায় দিন বদল

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ লক্ষ্মীপুরে প্রতিবছরই নারকেলের বাম্পার ফলন হয়। এখানকার নারকেল দেশের চাহিদার বিশাল অংশের যোগান দেয়। লক্ষ্মীপুরের উৎপাদিত নারকেল থেকে তৈরি হয় মুখরোচক খাবার ও তেল।

শুধু তাই নয় এর ছোবড়া জ্বালানি ছাড়াও জাজিম, পাপোস, রশি, সোফা ও চেয়ারের গদিসহ বিভিন্ন ধরনের সৌখিন ও প্রয়োজনীয় পণ্য তৈরিতে ব্যবহার হয়। এসব তৈরিতে যথাযথ বিকল্প উপকরণ না থাকায় লক্ষ্মীপুরে নারকেলের ছোবড়ার বেশ কদর। নারকেলের ছোবড়া প্রক্রিয়ায় দিন বদলের চেষ্টা এ অঞ্চলের মানুষের।

প্রয়োজনীয় পণ্য তৈরি করতে প্রথমে নারকেলের ছোবড়াকে প্রক্রিয়াকরণ করতে হয়। মেশিনের সাহায্যে বের করা হয় আঁশ। এটি করতে আলাদাভাবে প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয় না। যে কারণে সহজেই অল্প পুজিঁর মাধ্যমে এ ব্যবসা শুরু করা যায়।

পুঁজির স্বল্পতায় টিকে থাকার অনিশ্চয়তা দেখা দিলে হাল ছেড়ে দেন অনেকে। আবার কেউ কেউ হাল না ছেড়ে পরবর্তীতে মাটিতে লোহা পুঁতে আধাআধি খোসা ছিলে সরবরাহ করা শুরু করেন। আর লক্ষ্মীপুরে ছোবড়াকে ঘিরেও গড়ে উঠেছে লাভজনক ব্যবসা।সদরের দালালবাজার, বেড়ির মাথা, মান্দারী ও চন্দ্রগঞ্জ, রায়পুরের হায়দরগঞ্জ, চরবংশী, রাখালিয়াসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে নারকেল ছোবড়া প্রক্রিয়াজাত ছোট ছোট কারখানা। এসব ছোবড়া প্রক্রিয়া কারখানায় কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে শত শত শ্রমিক।

কারখানায় প্রতিদিন কয়েক টন ছোবড়াকে মেশিনের মাধ্যমে আঁশে পরিণত করা হয়। ছোবড়ার ব্যাপক চাহিদা থাকায় লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলাসহ রায়পুর, রামগতি, কমলনগরের বিভিন্ন স্থানে ৫০টিরও বেশি ছোবড়া প্রক্রিয়াকরণ কারাখানা ও ব্যবসা গড়ে উঠেছে। এতে শত শত লোকের কর্মসংস্থানেরও সৃষ্টি হয়েছে। এক সময় নারকেলের অনেক কিছু ময়লা, অপ্রয়োজনীয় ভেবে ফেলে দিলেও এখন সবকিছুই ব্যবহারযোগ্য। নারকেলের নানাবিধ কাঁচামাল দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রফতানি করা হয়। এসব কারখানায় প্রতিদিন কয়েক টন ছোবড়াকে আঁশে পরিণত করা হয়।

সদরের দালালবাজার গিয়ে দেখা যায়, শুরুতে গ্রামগঞ্জের বিভিন্ন হাট থেকে নারকেল সংগ্রহ করে বিভিন্ন আড়তে সরবরাহ করেন স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। আবার স্থানীয় নারকেল বাগান মালিকরাও সাপ্তাহিক হাট-বাজার গুলোর আড়তে এসে বিক্রি করে। মজুদ করার একপর্যায়ে লোকবল তথা শ্রমিক নিয়ে শুরু হয় নারকেল ছাড়ানো। নারকেলের ভেতরের অংশ আলাদা করে ছোবড়াকে নিদিষ্ট স্থানে মজুদ রেখে দেয়া হয়। পরবর্তীতে এসব ছোবড়া প্রক্রিয়াকরণের জন্য পাঠানো হয় মেশিনে। প্রতিটি নারকেলের ছোবড়া জাতবেধে ৩ টাকা থেকে ৫ টাকা পর্যন্ত হয়। জানা গেছে, নারিকেলের ছোবড়া দিয়ে খুব সহজ প্রযুক্তিতে বিভিন্ন পণ্য তৈরি করা যায়। এটি সহজলভ্য, দামেও সস্তা। ছোবড়া পিস ও মণে বিক্রি হয়ে থাকে। আর ছোবড়া থেকে তৈরি সৌখিন ও আরামদায়ক পণ্য দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রফতানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব।

লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার দালাল বাজারের ব্যবসায়ী শাহ আলম জানান, তিনি দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে নারকেলের ব্যবসা করে আসছেন। আগে নারকেলের খোসা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হতো। বর্তমানে জাজিম, পাপোস, রশি, সোফাসহ প্রয়োজনীয় পণ্য তৈরিতে ব্যবহার হয়ে আসছে। যে কারণে গত কয়েক বছর থেকে ছোবড়ার ব্যাপক চাহিদা বেড়েছে। এখন নারকেল ও ছোবড়া আলাদা বিক্রি করেন। তাতে তার লাভও বেশি হয়।

নারকেলের চোঁচা তৈরির সময় যে ভুষি বের হয় তা ছাদবাগানের কাজে ব্যবহার হচ্ছে। দালাল বাজার প্রতিবছর শুধু ভুসি বিক্রি থেকে আয় হয় ৫০ লাখ টাকা।

স্থানীয় নারকেল বিক্রেতা মো. আব্দুল্লাহ জানান, নারকেলের ছোবড়া প্রক্রিয়া করার কোনো কারিগর আগে লক্ষ্মীপুরে ছিল না। এখন জেলার মান্দারি, চন্দ্রগঞ্জ, রাখালিয়া, হায়দরগঞ্জে তৈরি হয়েছে কারিগর। তবে চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল হওয়ায় ফেনী, চট্রগাম থেকে বেতনের পাশাপাশি থাকা-খাওয়ার সুবিধা দিয়ে কারিগর আনতে হয়েছে। প্রতিটি কারখানায় এখন স্থানীয় ও বাইরের ১৫-১৬ জন দক্ষ শ্রমিক আছে। মেশিনের সাহায্যে ছোবড়া থেকে আঁশ বের করে প্রতি মণ ২ থেকে আড়াই হাজার টাকা দরে বিক্রি করেন। সপ্তাহে তিনি ৪ থেকে ৮ ট্রাক ছোবড়া বিক্রি করেন। সব খরচ শেষে মাসে তার ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা আয় হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নারকেলের তুষ ফলের অংশ হওয়ায় গাছের বৃদ্ধির জন্য দরকারি সব পরিমাণ পুষ্টি বিশেষ করে পটাশিয়াম জাতীয় পদার্থ থাকে। পচানোর পর মাটিতে প্রয়োগ করলে মাটির পানি ধারণক্ষমতা ও অন্যান্য ভৌতিক গুণাবলি বৃদ্ধিসহ অণুজীবের কার্যক্রম বৃদ্ধি করে দীর্ঘমেয়াদে গাছের পুষ্টি সরবরাহ ও বৃদ্ধি-সহায়তা প্রদান করে। তারা মনে করেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় সব চাহিদার জোগান দিলেও আমাদের দেশে নারিকেল অনেকটা অবহেলিত রয়ে গেছে।

নারকেল গবেষণা ও সম্প্রসারণ কার্যক্রম জোরদার করার মাধ্যমে নারকেলের ফলন ও উৎপাদন বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে নার্সারির চারা তৈরি কলম লাগানোর ক্ষেত্রে নারকেলের ছোবড়া নতুন সম্ভাবনা নিয়ে এসেছে। একে কাজে লাগিয়ে কৃষিকে আরো সমৃদ্ধ করতে হবে।

লক্ষ্মীপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর উপ পরিচালক কৃষিবিদ ড. মো. জাকির হোসেন  বলেন, লক্ষ্মীপুর সুপারির পাশপাশি নারকেল খ্যাত জেলা। এই জেলায় পরিকল্পিতভাবে কৃষকরা নারকেল বাগান করে। বছরে কয়েক কোটি টাকার নারকেল বিক্রি করে জীবিকা চালায়। এর সঙ্গে নারকেলের ছোবড়ার যথেষ্ট কদর রয়েছে।

জেলায় ছোট বড়া প্রায় ৫০টি ছোবড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ মেশিন রয়েছে। যে গুলো দিয়ে শ্রমিকরা ছোবড়া প্রক্রিয়া করে এবং তা জেলার বিভিন্ন স্থানে পাঠায়। এই পেশার সঙ্গে জড়িত জেলায় প্রায় দুই হাজার শ্রমিক যারা তাদের পরিবার চালায় এই কাজ করে। তবে নিদিষ্টি পরিমাণ না বলতে পারলেও স্থানীয়দের দেয়া তথ্যমতে বছরে আনুমানিক ১০ কোটি টাকার ছোবড়া বিক্রি করা হয়।

এই নিউজটি আপনার ফেসবুকে শেয়ার করুন

© shaistaganjerbani.com | All rights reserved.