রবিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ০৩:৪৬ পূর্বাহ্ন

লক্ষ্মীপুরে ২০০ কোটি টাকার নারিকেল উৎপাদন

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ মেঘনা নদীর উপকূলীয় জেলা লক্ষ্মীপুরে পরিকল্পিতভাবে নারিকেল চাষের পাশপাশি বাড়ির আঙ্গিনা, পুকর পাড়, জলা-নালা ও ডোবার পাড়ে, পতিত জমি ও কৃষি জমির পাশে নারিকেল গাছ লাগিয়ে বেশ লাভবান হচ্ছে লক্ষ্মীপুরের নারিকেল চাষিরা। আর দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে নারিকেলের চাষ।

নারিকেলের চারা গাছ রোপণের সময় প্রয়োজনীয় সার প্রয়োগ ও পরিচর্যা করতে হয়। গাছ লাগানোর পাঁচ-ছয় বছরের মধ্যে ফল পাওয়া যায়। এছাড়া প্রতি বর্ষা মৌসুমে গাছের মাথা পরিষ্কার করতে হয়। প্রতিটি গাছ ৫০ থেকে ৬০ বছর পর্যন্ত ফল দিয়ে থাকে। প্রতি গাছে বছরে ডাবের বিপরীত ২০০ থেকে ৫০০টি পর্যন্ত নারিকেল পাওয়া যায়। বাদাম, সয়াবিন ও সুপারির পাশাপাশি নারিকেল উৎপাদনে আগ্রহ এখানকার চাষিদের। সুপারি বছরে একবার পাওয়া গেলেও নারিকেল বছরের সবকটি দিনে পাওয়া যায়। তাইতো চাষীরা নারিকেল চাষে ঝুকছে। আর জেলায় অর্থকরী ফসল।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য মতে, লক্ষ্মীপুরে ২ হাজার ৬৫০ হেক্টর জমিতে নারিকেল বাগান রয়েছে। জেলায় এবার প্রায় ৫ কোটি ৩০ লাখ নারিকেল উৎপাদন হয়। এর বর্তমান বাজার মূল্য ২০০ কোটি টাকারও বেশি। এ মৌসুমে একজোড়া নারিকেল বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১২০ টাকা, যা গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণ দামে বিক্রি হচ্ছে। তবে এবারও নারিকেলের বাম্পার ফলন হয়েছে। নারিকেল কেনা-বেচায় এখন দারুণ সরগরম লক্ষ্মীপুরের বিভিন্ন হাট-বাজার। চলতি বছরে বিগত সময়ের চেয়ে দিগুণ নারকেল বিক্রি হবে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষি অধিদফতর।

প্রতি পিচ নারিকেল ৫০ থেকে ৬০ টাকা। যা বিগত বছরের তুলানায় দিগুণ দাম। লক্ষ্মীপুরে চলতি মৌসুমে প্রায় ২০০ কোটি টাকার নারিকেল উৎপাদন হয়েছে। নারিকেলের বৃহৎ বাজার লক্ষ্মীপুরের দালাল বাজার। জেলা প্রধান নারিকেলে মোকাম হচ্ছে সদর উপজেলার দালাল বাজার হিসেবে পরিচিত। এছাড়াও মান্দারী বাজার, জকসিন বাজার, রায়পুরের হায়দরগঞ্জ, রামগঞ্জের রামগঞ্জ শহর, কমলনগরের হাজিরহাট ও আর রামগতির রামগতি বাজার ও আলেকজান্ডার বাজারা নারিকেলের বড় মোকাম হিসেবে পরিচিত।

জেলায় ২ হাজার ৭৫০ একর জমিতে নারীকেলের বাগান রয়েছে। এর মধ্যে সদরে ১ হাজার ৫০ হাজার হেক্টর, রামগঞ্জে ৫১০ হেক্টর, রায়পুরে ৩৬৫ হেক্টর, কমলনগরে ৩৫০ হেক্টর ও রামগতি ১৬০ হেক্টর জমিতে নারীকেলের চাষ রয়েছে। এখানকার নারকেল দিয়েই সারাদেশের নারিকেলের চাহিদার সিংগভাগই মিটে থাকে। প্রতি বছর ১০ থেকে ১২ কোটি টাকার নারিকেলের ছোবড়াও বিক্রি করা হয়। এখানকার উৎপাদিত নারিকেল সুস্বাদু ও তেলের গুণগতমান ভালো হওয়ায় এ অঞ্চলের চাহিদা মিটিয়ে সরবরাহ হচ্ছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উপকূলীয় এ জেলায় নারিকেল ভিত্তিক শিল্প-কারখানা স্থাপিত হলে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগের পাশাপাশি গতিশীল হবে এ অঞ্চলের অর্থনীতি।

রায়পুর উপজেলার হায়দরগঞ্জ বাজারের নারিকেল ব্যবসায়ী শাহ আলম মাতবর জানান, ৪০ বছর ধরে নারিকেল ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। চলতি মৌসুমে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় উৎপাদন ভালো হয়েছে। বাজারে চাহিদা থাকায় চাষিরাও ভালো দাম পেয়েছেন। এখানকার উৎপাদিত নারিকেলের গুণগতমান ভালো হওয়ায় দেশের বিভিন্ন জেলায় এর ব্যাপক চাহিদার পাশাপাশি তেল কোম্পানিদেরও এখানকার নারিকেল সংগ্রহ করার আগ্রহ বেড়েছে।

উপকূলীয় জেলা লক্ষ্মীপুরে ভৌগলিক কারণে ও উপযোগী মাটি হওয়ায় নারকেলের বাম্পার ফলন হয়। এখানকার গ্রামে গ্রামে সারি সারি নারকেল গাছ।

নারিকেল ব্যবসায়ী আমীর গাজী জানান, চলতি মৌসুমে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় নারকেলের উৎপাদন ভালো হয়েছে। বাজারে চাহিদা থাকায় চাষিরাও ভালো দাম পেয়েছে। এখানকার উৎপাদিত নারকেলের গুণগতমান ভাল হওয়ায় দেশের বিভিন্ন জেলায় এর ব্যাপক চাহিদার পাশাপাশি তেল কোম্পানিও এখানকার নারকেল সংগ্রহ করার আগ্রহ বেড়েছে।

এদিকে সদর উপজেলার চররুহিতা গ্রামের নারিকেল ব্যবসায়ী কবির খাঁ জানান, এ অঞ্চলে নারিকেল ভিত্তিক শিল্প কারখানা গড়ে উঠলে চাষিরা যেমন ভালো দাম পেতেন, তেমনি লাভবান হতেন ব্যবসায়ীরাও।

একই গ্রামের নারিকেল চাষি জামাল উদ্দিন জানান, তার দেড় একর জমিতে পুকুর ছিল। পুকুরের চারপাশে তিনি নারিকেল বাগান করে এখন বেশ লাভবান হচ্ছেন। দালাল বাজার এলাকার বাসিন্দা নারকেল ছোবড়া ছাড়ানো শ্রমিক নারায়ণ জানান, এক যুগের বেশি সময় ধরে নারকেলের ছোবড়া ছাড়ানের কাজ করেন তিনি। ৫০ পয়সা থেকে দেড় টাকা পর্যন্ত প্রতি পিসের ছোবড়া ছাড়ানোর কাজ নেন। এতে প্রতিদিন ৭০০ থেক ১২০০ টাকা রোজগার হয়। শুধু দালাল বাজার এলাকাতে প্রায় ৫০ জন শ্রমিক এ কাজ করেন। এদের মধ্যে কেউ কেউ মাসিক চুক্তিতেও কাজ করছেন বলে জানা গেছে।

বাজারের আশপাশে বেশ কয়েকটা আড়ৎ রয়েছে। প্রতিদিন এসব আড়তে হাজার হাজার নারিকেল থেকে ছোবড়া ছাড়ানো হয়। বছরে ১০ থেকে ১২ কোটি টাকা শুধু নারিকেলের ছোবড়া বিক্রি হয়। এখানকার উৎপাদিত নারিকেল জেলার চাহিদা মিটিয়ে ঢাকা, চট্রগ্রাম, বাগেরহাট, ভৈরব, বান্দরবান. রাঙ্গামাটি, ফরিদপুর, ময়মনসিংহ সহ বিভিন্ন জেলায় রপ্তানি করা হয়।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ ড. মো. জাকির হোসেন  বলেন, বিগত বছরের তুলনায় লক্ষ্মীপুরে জেলায় এবার প্রায় ৫ কোটি ৩০ লাখ নারিকেল উৎপাদন হয়। এর বর্তমান বাজার মূল্য ২০০ কোটি টাকারও বেশি। ‘এখানকার মাটি নারিকেল চাষের জন্য বেশ উপযোগী। এ অঞ্চলে নারিকেল ভিত্তিক শিল্প-কারখানা গড়ে উঠলে কৃষকরা যেমন লাভবান হতো, তেমনি গতিশীলতা পেতো এ অঞ্চলের অর্থনীতি। এছাড়া নারিকেল সমৃদ্ধ এ জেলায় নারিকেল ভিত্তিক শিল্প কারখানা গড়ে উঠলে চাষিরা সঠিক দাম পেতে। একই সঙ্গে জেলার মানুষের কর্মসংস্থান হতো। তাই জেলায় নারিকেল ভিত্তিক কারখানা গড়ে তোলা খুবই জরুরী বলে মনে করেন এই কর্মকর্তা।

এই নিউজটি আপনার ফেসবুকে শেয়ার করুন

© shaistaganjerbani.com | All rights reserved.