সোমবার, ১৭ Jun ২০২৪, ১২:৩২ অপরাহ্ন

হবিগঞ্জ জেলায় আ. লীগ ৫, বিএনপি ৩ ও ১ স্বতন্ত্র প্রার্থী বিজয়ী

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ জেলায় সুষ্টু ও শান্তিপূর্ণ ভাবে ৯টি উপজেলা পরিষদ নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। জেলায় ৪টি ধাপে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ-৫, বিএনপি-৩ ও ১ স্বতন্ত্র প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। হবিগঞ্জ সদর, লাখাই, শায়েস্তাগঞ্জ, বানিয়াচং ও আজমিরীগঞ্জ উপজেলায় আওয়ামী লীগ নেতারা বিজয় লাভ করেছেন। তবে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ দ্ব›দ্ব-কোন্দলকে পুঁজি করে চুনারুঘাট ও নবীগঞ্জে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপির বহিষ্কৃত ২ নেতা। মাধবপুরে সায়হাম গ্রæপের জনপ্রিয়তা ও কর্মস্থান সৃষ্টিকে কাজে লাগিয়ে বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয় ছিনিয়ে নিয়েছেন বিএনপি নেতা। এছাড়া বাহুবলে আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থী থাকায় স্বতন্ত্র প্রার্থী বিজয় লাভ করেছেন।
প্রথম ধাপে আজমিরীগঞ্জ ও বানিয়াচং উপজেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। দুই উপজেলায় বিএনপির কোন প্রার্থী অংশ না নেয়ায় আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে দেখা দেয় ভোট যুদ্ধ। আজমিরীগঞ্জে চেয়ারম্যান পদে ৬ ও বানিয়াচংয়ে ৩ আওয়ামীলীগ নেতা নির্বাচনে অংশ নেন। এর মধ্যে আজমিরীগঞ্জে ১৫ হাজার ৪৮১ টি ভোট পেয়ে বিজয়ী হন সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও আওয়ামীলীগ নেতা মো.আলাউদ্দিন মিয়া। তার নিকটতম প্রতিদ্ব›িদ্ব প্রার্থী উপজেলা আওয়ামীলীগের সাবেক সহ-সভাপতি ও শিবপাশা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আলী আমজাদ তালুকদার ১২ হাজার ৫০৩ ভোট পেয়ে পরাজিত হন।বানিয়াচংয়ে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন খান ৪২ হাজার ৮২৩ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্ব›িদ্ব প্রার্থী হবিগঞ্জ জেলা যুবলীগের সভাপতি ও বর্তমান চেয়ারম্যান আবুল কাসেম চৌধুরী ৩১ হাজার ৭৭২ ভোট পেয়ে পরাজিত হন।
২য় ধাপে বাহুবল ও নবীগঞ্জ উপজেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
বাহুবলে চেয়ারম্যান পদে ৭ জন প্রার্থী প্রতিদ্ব›িদ্বতা করেন। এতে আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থী থাকায় জয় লাভ করেন স্বতন্ত্র প্রার্থী মোহাম্মদ আনোয়ার হোসাইন। তিনি ১৮ হাজার ৬৮২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্ব›িদ্ব প্রার্থী সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোঃ আব্দুল হাই ১২ হাজার ৭৮৪ ভোট পেয়ে পরাজিত হয়েছেন। এছাড়া আওয়ামী লীগ নেতা রাজন চৌধুরী পেয়েছেন ১২ হাজার ৭৯ ভোট ও মোঃ আব্দুল কাদির চৌধুরী ৭ হাজার ৩৭৩ ভোট ও আক্তারুজ্জামান নাসির ৫ হাজার ৮৪ ভোট পেয়ে পরাজিত হন
নবীগঞ্জে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের প্রভাবশালী ৫ নেতাকে হারিয়ে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা মুজিবুর রহমান চৌধুরী শেফু। তিনি ২৫ হাজার ১৫৯ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্ব›িদ্ব প্রার্থী বর্তমান চেয়ারম্যান ও উপজেলা যুবলীগের সাবেক আহŸায়ক ফজলুল হক চৌধুরী সেলিম ২১ হাজার ৭৫১ ভোট পেয়ে পরাজিত হয়েছেন। এছাড়া জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট সুলতান মাহমুদ পেয়েছেন ২০ হাজার ৫৬৩ ভোট, জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নুর উদ্দিন চৌধুরী বুলবুল ১৭ হাজার ৯৪২ ভোট, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও ইউপি চেয়ারম্যান ইমদাদুর রহমান মুকুল ১৭ হাজার ৪৭ ভোট ও জেলা যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক বোরহান উদ্দিন চৌধুরী পেয়েছেন ৩ হাজার ৩৭৬ ভোট। ওই উপজেলায় আওয়ামী লীগের এমন ভরাডুবির পেছনে দলীয় কোন্দল, আঞ্চলিকতাকে দায়ী করছেন নেতা-কর্মীরা। তাদের দাবী ভোট ভাগাভাগির কারণে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা পরাজিত হয়েছেন। অন্যদিকে উপজেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-আহŸায়ক মুজিবুর রহমান চৌধুরী শেফু ছিলেন একমাত্র প্রার্থী। তাই তার ভোটে ভাগের প্রভাব পড়েনি। ফলে অনেকটা সহজেই জয় পেয়ে যান তিনি।
৩য় ধাপে হবিগঞ্জ সদর, লাখাই ও শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে হবিগঞ্জ সদর ব্যতিত দুটি উপজেলায় আওয়ামী লীগের প্রতিদ্ব›িদ্ব ছিল আওয়ামীলীগ। সদর উপজেলায় বিএনপি নেতা মহিবুল ইসলাম শাহীন নির্বাচনে অংশ নিলেও আওয়ামী লীগ নেতাদের কাছে ধরাশায়ী হয়েছেন তিনি। নির্বাচনে শুরু থেকেই হবিগঞ্জ পৌর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান চেয়ারম্যান মোতাচ্ছিরুল ইসলাম ও জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মশিউর রহমান শামীম ছিলেন আলোচনায়। পরে তাদের মধ্যেই দেখা দেয় জয়-পরাজয়। নির্বাচনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে ৩৬ হাজার ৪১৯ ভোট পেয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন মোতাচ্ছিরুল ইসলাম। তার নিকটতম প্রার্থী মশিউর রহমান শামীম পান ৩৩ হাজার ৭১৫ ভোট। এছাড়াও বিএনপি নেতা মুহিবুল ইসলাম শাহীন ১০২১৭, চৌধুরী নিয়াজ মাহমুদ ৪ হাজার ৫০৫, ওয়াসিম উদ্দিন ৩ হাজার ৪৫৬ ও সৈয়দ আশিকুর রহমান ২ হাজার ৮২২ ভোট জামানত হারান।
লাখাই উপজেলা পরিষদ নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে দেখা দেয় ভোট য্দ্ধু। নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে হ্যাট্রিক করেছেন বর্তমান চেয়ারম্যান মুশফিউল আলম আজাদ। তিনি ৩২ হাজার ৯২২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্ব›িদ্ব প্রার্থী মাহফুজুল আলম ২৪ হাজার ৪৪৫ ভোট। এছাড়াও মোঃ আমিরুল ইসলাম ৬ হাজার ৯৪৮ ও উপজেলা যুবলীগের আহবায়ক ইকরামুল মজিদ চৌধুরী পেয়েছেন ৭ হাজার ৪৬ ভোট।
শায়েস্তাগঞ্জে বিএনপির প্রার্থী অংশ না নেয়ায় লড়াই হয় আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে। ওই উপজেলায় দ্বিতীয় বারের মতো বিজয়ী হয়েছেন বর্তমান চেয়ারম্যান আব্দুর রশিদ তালুকদার ইকবাল। তিনি ১৫ হাজার ৩০০ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তার নিকটতম প্রার্থী আওয়ামী লীগ নেতা আতাউর রহমান মাসুক ১১ হাজার ৭৫৯ ভোট পেয়ে পরাজিত হন। ওই উপজেলায় জাতীয় পার্টি নেতা মোঃ রকিব আহমেদ ২৬৭ ভোট ও  মোঃ সুরুজ আলী মোল্লা ৩১১ ভোট পেয়ে জামানত হারান।
৪র্থ ধাপে মাধবপুর ও চুনারুঘাট উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের বিপুল ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে জয়ী হয়েছেন বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত ও পদত্যাগকারী দুই নেতা। তাঁদের মধ্যে মাধবপুর উপজেলা পরিষদে সৈয়দ মোহাম্মদ শাহজাহান এ নিয়ে ৪ চেয়ারম্যান হলেন। চুনারুঘাটে সৈয়দ লিয়াকত হাসান প্রথমবার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন।
মাধবপুরে চেয়ারম্যান পদে জয় পাওয়া সৈয়দ মোহাম্মদ শাহজাহান জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি ও উপজেলা বিএনপির সভাপতি  ছিলেন। নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় বিএনপি তাঁকে বহিষ্কার করেছে। চুনারুঘাটে সৈয়দ লিয়াকত হাসান উপজেলা বিএনপির সভাপতি ছিলেন। নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আগে তিনি সভাপতি পদ থেকে পদত্যাগ করেন।
মাধবপুরে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী ছিলেন তিনজন। এর মধ্যে দুজনই আওয়ামী লীগের। তাঁরা হলেন হবিগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মো. জাকির হোসেন অসীম ও মাধবপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য সৈয়দ শাহ হাবিব উল্লাহ। নির্বাচনে জয়ী হন অপর প্রার্থী বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা সৈয়দ মোহাম্মদ শাহজাহান। তিনি ৬২ হাজার ২৫২ ভোট পান। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্ব›দ্বী আওয়ামী লীগের নেতা মোঃ জাকির হোসেন ৩৮ হাজার ৫২ জন। এ দুজনের ভোটের ব্যবধান ২৪ হাজার ২০০।
দলীয় নেতা-কর্মীরা বলেন, ওই উপজেলায় সায়হাম গ্রæপের কর্ণধার চেয়ারম্যান প্রার্থী সৈয়দ মোহাম্মদ শাহজাহান। এলাকায় গণ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে তাদরে পরিবার। বর্তমান উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে তিনি সায়হাম গ্রæপের জনপ্রিয়তা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে কাজে লাগিয়ে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছেন তিনি। এর আগেও তিনি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয় লাভ করেছেন।
চুনারুঘাটে থেকে চেয়ারম্যান পদে ৫ প্রার্থী প্রতিদ্ব›িদ্বতা করেন। তাঁরা হলেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মোঃ আবু তাহের, উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক লুৎফর রহমান চৌধুরী, আওয়ামী লীগ সমর্থিত মোঃ রায়হান উদ্দিন, হাবিবুর রহমান এবং উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি সৈয়দ লিয়াকত হাসান। ওই উপজেলায় আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থী থাকায় ভোটের ব্যাংক ভারী হয় বিএনপি নেতা সৈয়দ লিয়াকত হাসানের। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে নির্বাচনে অংশ নেয়ায় তাকে বহিঃস্কার করা হলেও তিনি ৫২ হাজার ৮২৯ ভোট পেয়ে জয়ী হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্ব›দ্বী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মোঃ আবু তাহের পান ৩৫ হাজার ৫৬২ ভোট। দুজনের ভোটের ব্যবধান ১৭ হাজার ২৬৭।
নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ আওয়ামী লীগ নেতা মোঃ আবু তাহেরকে হারিয়ে জয়ী হওয়া সৈয়দ লিয়াকত হাসানকে নিয়েই সর্বত্র আলোচনা। বিপুল ভোটের ব্যবধানে আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে হারিয়ে চমক দেখান তিনি। স্থানীয় লোকজন বলছেন, আওয়ামী লীগের দলীয় কোন্দল থাকায় তিনি জয় পেয়েছেন।

এই নিউজটি আপনার ফেসবুকে শেয়ার করুন

© shaistaganjerbani.com | All rights reserved.