ঢাকা ১২:০৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬, ৩১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo বাংলাদেশের গণতন্ত্রের আপোষহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া Logo চুনারুঘাটে চা-বাগানে বাড়ছে যক্ষ্মা, হাসপাতালে ওষুধ সংকট Logo শায়েস্তাগঞ্জে পিকআপের ধাক্কায় টমটম চালক নিহত Logo বাহুবল ফল প্রকাশের আগেরদিন মৃত্যু, সেই রেজা এসএসসিতে পেয়েছে ৪.১১ Logo হবিগঞ্জে ফল বিক্রেতার মোবাইল চুরির অভিযোগে এসআই ক্লোজড Logo জুলাই যোদ্ধাদের চাকুরির নিয়োগপত্র প্রদান সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সুন্দর বাংলাদেশ গড়তে চাই: প্রধানমন্ত্রী Logo একটি চক্র জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে: ‍প্রধানমন্ত্রী Logo জুলাই অভ্যুত্থানের মহানায়ক কোনো ব্যক্তি বা দল নয়, গণতন্ত্রকামী জনগণ : প্রধানমন্ত্রী Logo শায়েস্তাগঞ্জে আগস্টের বিজয় Logo হবিগঞ্জে এনসিপির মামলা: ছাত্রদল নেতা রিংগনসহ ১১ জনের জামিন

বাংলাদেশের গণতন্ত্রের আপোষহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া

॥মঈনুল হাসান রতন॥

১৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। এদিন জন্মগ্রহণ করেছিলেন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী, বিএনপির চেয়ারপারসন ও গণতন্ত্রের আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তাঁর ৮২তম জন্মদিন উপলক্ষে বিএনপির পক্ষ থেকে ঢাকাসহ সারাদেশে দলীয় কার্যালয় ও মসজিদে মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে।

শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকালে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ কর্মসূচির কথা জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, শনিবার সকাল ১১টায় ঢাকার নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। এতে দলের সিনিয়র নেতৃবৃন্দ উপস্থিত থাকবেন। একই সঙ্গে দেশব্যাপী বিএনপি এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের মিলাদ ও দোয়া মাহফিলে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

তবে এবার জন্মদিনের আয়োজনের আবহ অন্যরকম। কারণ, যাঁকে ঘিরে এই আয়োজন, সেই দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আজ আমাদের মাঝে নেই। গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর মঙ্গলবার সকাল ৬টায় ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। তাঁর মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর দল-মত নির্বিশেষে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নেমে আসে শোকের ছায়া।

বেগম খালেদা জিয়া শুধু একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান ছিলেন না; দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি দেশের কোটি মানুষের কাছে একজন পরিচিত ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে তাঁর ভূমিকা নিয়ে বহু আলোচনা, বিতর্ক ও মূল্যায়ন রয়েছে। কিন্তু একটি বিষয় অনস্বীকার্য বাংলাদেশের রাজনীতির দীর্ঘ কয়েক দশকের ইতিহাসে তাঁর নাম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুরে ইস্কান্দার মজুমদার ও তৈয়বা মজুমদারের ঘরে জন্মগ্রহণ করেন বেগম খালেদা জিয়া। দিনাজপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন এবং পরবর্তীতে সুরেন্দ্রনাথ কলেজে অধ্যয়ন করেন। ১৯৬০ সালে তিনি তৎকালীন সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী হিসেবে তিনি দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে পরিচিতি লাভ করেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তাঁর উপস্থিতি তৈরি হয়। বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সফরে তিনি বিশ্বনেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। কিন্তু ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাতবরণের পর তাঁর জীবনে আসে এক নতুন অধ্যায়।

১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি সাধারণ সদস্য হিসেবে বিএনপিতে যোগ দেন খালেদা জিয়া। পরবর্তীতে দলের ভাইস চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালের আগস্টে চেয়ারপারসনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সেই সময় বাংলাদেশের রাজনীতি ছিল উত্তাল। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন।

এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তাঁর দৃঢ় অবস্থান তাঁকে ‘আপোষহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিতি এনে দেয়। ১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে তাঁকে আটক করা হয়। ১৯৮৬ সালের নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্তসহ সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে।

দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পর ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটে। ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর নেতৃত্বে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর শাসনামলে শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন, পোশাকশিল্প, কর্মসংস্থানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়। মেয়েদের শিক্ষায় উপবৃত্তি, প্রাথমিক শিক্ষায় বিনামূল্যে বই ও শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণসহ বেশ কিছু পদক্ষেপ তাঁর সরকারের সময় বাস্তবায়িত হয়। তৈরি পোশাকশিল্পেও নারীদের অংশগ্রহণ দ্রুত বাড়তে থাকে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন স্বার্থের বিষয় তুলে ধরেছেন। গঙ্গার পানি বণ্টনসহ বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উপস্থাপনের ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা ছিল।

১৯৯৬ সালের নির্বাচনী রাজনীতিতে তাঁর দল ক্ষমতা হারালেও সংসদে বিএনপি বড় বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। পরবর্তীতে ১৯৯৯ সালে চারদলীয় জোট গঠনের মাধ্যমে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়। ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হন বেগম খালেদা জিয়া।

তাঁর সরকারের সময় শিক্ষা, বিশেষ করে নারীশিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়নে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়। মেয়েদের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষা, উপবৃত্তি এবং শিক্ষা কার্যক্রমে বিভিন্ন সহায়তা কর্মসূচি চালু করা হয়। নারীশিক্ষা ও ক্ষমতায়নে ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও তিনি বিভিন্ন সময়ে প্রশংসিত হন।

তবে তাঁর রাজনৈতিক জীবন ছিল শুধু ক্ষমতার রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়। বিরোধী দলীয় নেত্রী হিসেবেও তিনি দীর্ঘ সময় রাজপথে সক্রিয় ছিলেন। রাজনৈতিক প্রতিকূলতা, মামলা, গ্রেপ্তার, কারাবাস ও গৃহবন্দিত্ব সবকিছুর মধ্যেও তিনি তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন।

২০০৭ সালে জরুরি অবস্থার সময় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। দীর্ঘ কারাবাসের পর ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তিনি মুক্তি পান। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে দুর্নীতির মামলায় তাঁর কারাদন্ড হয়। অসুস্থতার কারণে তাঁকে কারাগার থেকে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং ২০২০ সালের মার্চে সরকারের নির্বাহী সিদ্ধান্তে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি দেওয়া হয়। দীর্ঘ সময় তিনি চিকিৎসাধীন ও রাজনৈতিকভাবে সীমাবদ্ধ অবস্থায় ছিলেন।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাঁর মুক্তির পথ উন্মুক্ত হয়। পরবর্তীতে তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় দেশবাসীর উদ্দেশে বক্তব্য দেন। জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত তাঁর রাজনৈতিক উপস্থিতি ও জনসম্পৃক্ততা দেশের রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল।

তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের অবসান ঘটে। তাঁর মৃত্যুতে রাষ্ট্রীয়ভাবে শোক পালন করা হয় এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক মহল থেকে শোক প্রকাশ করা হয়। বিএনপিও দলীয়ভাবে শোক কর্মসূচি ঘোষণা করে।

বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন ছিল সংগ্রাম, সাফল্য, বিতর্ক, আন্দোলন ও প্রতিকূলতায় পরিপূর্ণ। তাঁকে কেউ দেখেছেন গণতন্ত্রের আপোষহীন নেত্রী হিসেবে, কেউ দেখেছেন একজন শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও বাংলাদেশের আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁর প্রভাব অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

তিনি ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। তিনবার সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেছেন। রাজপথের আন্দোলন থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা—দুই ক্ষেত্রেই তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ রেখে গেছেন।

আজ তাঁর জন্মদিনে দলীয় নেতা-কর্মীরা তাঁকে স্মরণ করছেন দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের মাধ্যমে। কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার শুধু একটি দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে। ইতিহাসের বিচারে বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনীতির এমন এক চরিত্র, যাঁকে বাদ দিয়ে দেশের গত কয়েক দশকের রাজনৈতিক ইতিহাস লেখা কঠিন।

আপোষহীন দেশনেত্রী, আপনার বিদায় আমাদের জন্য গভীর বেদনার। আপনার শূন্যতা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে আপনার নাম উচ্চারিত হবে নানা মূল্যায়ন ও আলোচনার মধ্য দিয়ে। রাজনৈতিক জীবনের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় আপনি যে অধ্যায় রচনা করে গেছেন, তা বাংলাদেশের ইতিহাসের পাতায় দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

আজ আপনার জন্মদিনে গভীর শ্রদ্ধায় আপনাকে স্মরণ করছি। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আপনার জীবনের সকল ভুলত্রুটি ক্ষমা করে আপনাকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মাকাম দান করুন। আমিন।

মঈনুল হাসান রতন
লেখক ও সাংবাদিক
সভাপতি, শায়েস্তাগঞ্জ প্রেসক্লাব, হবিগঞ্জ।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপডেট সময় ১২:০৪:৪৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬
০ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশের গণতন্ত্রের আপোষহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া

আপডেট সময় ১২:০৪:৪৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬

১৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। এদিন জন্মগ্রহণ করেছিলেন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী, বিএনপির চেয়ারপারসন ও গণতন্ত্রের আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তাঁর ৮২তম জন্মদিন উপলক্ষে বিএনপির পক্ষ থেকে ঢাকাসহ সারাদেশে দলীয় কার্যালয় ও মসজিদে মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে।

শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকালে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ কর্মসূচির কথা জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, শনিবার সকাল ১১টায় ঢাকার নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। এতে দলের সিনিয়র নেতৃবৃন্দ উপস্থিত থাকবেন। একই সঙ্গে দেশব্যাপী বিএনপি এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের মিলাদ ও দোয়া মাহফিলে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

তবে এবার জন্মদিনের আয়োজনের আবহ অন্যরকম। কারণ, যাঁকে ঘিরে এই আয়োজন, সেই দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আজ আমাদের মাঝে নেই। গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর মঙ্গলবার সকাল ৬টায় ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। তাঁর মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর দল-মত নির্বিশেষে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নেমে আসে শোকের ছায়া।

বেগম খালেদা জিয়া শুধু একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান ছিলেন না; দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি দেশের কোটি মানুষের কাছে একজন পরিচিত ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে তাঁর ভূমিকা নিয়ে বহু আলোচনা, বিতর্ক ও মূল্যায়ন রয়েছে। কিন্তু একটি বিষয় অনস্বীকার্য বাংলাদেশের রাজনীতির দীর্ঘ কয়েক দশকের ইতিহাসে তাঁর নাম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুরে ইস্কান্দার মজুমদার ও তৈয়বা মজুমদারের ঘরে জন্মগ্রহণ করেন বেগম খালেদা জিয়া। দিনাজপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন এবং পরবর্তীতে সুরেন্দ্রনাথ কলেজে অধ্যয়ন করেন। ১৯৬০ সালে তিনি তৎকালীন সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী হিসেবে তিনি দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে পরিচিতি লাভ করেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তাঁর উপস্থিতি তৈরি হয়। বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সফরে তিনি বিশ্বনেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। কিন্তু ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাতবরণের পর তাঁর জীবনে আসে এক নতুন অধ্যায়।

১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি সাধারণ সদস্য হিসেবে বিএনপিতে যোগ দেন খালেদা জিয়া। পরবর্তীতে দলের ভাইস চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালের আগস্টে চেয়ারপারসনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সেই সময় বাংলাদেশের রাজনীতি ছিল উত্তাল। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন।

এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তাঁর দৃঢ় অবস্থান তাঁকে ‘আপোষহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিতি এনে দেয়। ১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে তাঁকে আটক করা হয়। ১৯৮৬ সালের নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্তসহ সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে।

দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পর ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটে। ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর নেতৃত্বে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর শাসনামলে শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন, পোশাকশিল্প, কর্মসংস্থানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়। মেয়েদের শিক্ষায় উপবৃত্তি, প্রাথমিক শিক্ষায় বিনামূল্যে বই ও শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণসহ বেশ কিছু পদক্ষেপ তাঁর সরকারের সময় বাস্তবায়িত হয়। তৈরি পোশাকশিল্পেও নারীদের অংশগ্রহণ দ্রুত বাড়তে থাকে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন স্বার্থের বিষয় তুলে ধরেছেন। গঙ্গার পানি বণ্টনসহ বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উপস্থাপনের ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা ছিল।

১৯৯৬ সালের নির্বাচনী রাজনীতিতে তাঁর দল ক্ষমতা হারালেও সংসদে বিএনপি বড় বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। পরবর্তীতে ১৯৯৯ সালে চারদলীয় জোট গঠনের মাধ্যমে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়। ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হন বেগম খালেদা জিয়া।

তাঁর সরকারের সময় শিক্ষা, বিশেষ করে নারীশিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়নে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়। মেয়েদের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষা, উপবৃত্তি এবং শিক্ষা কার্যক্রমে বিভিন্ন সহায়তা কর্মসূচি চালু করা হয়। নারীশিক্ষা ও ক্ষমতায়নে ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও তিনি বিভিন্ন সময়ে প্রশংসিত হন।

তবে তাঁর রাজনৈতিক জীবন ছিল শুধু ক্ষমতার রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়। বিরোধী দলীয় নেত্রী হিসেবেও তিনি দীর্ঘ সময় রাজপথে সক্রিয় ছিলেন। রাজনৈতিক প্রতিকূলতা, মামলা, গ্রেপ্তার, কারাবাস ও গৃহবন্দিত্ব সবকিছুর মধ্যেও তিনি তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন।

২০০৭ সালে জরুরি অবস্থার সময় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। দীর্ঘ কারাবাসের পর ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তিনি মুক্তি পান। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে দুর্নীতির মামলায় তাঁর কারাদন্ড হয়। অসুস্থতার কারণে তাঁকে কারাগার থেকে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং ২০২০ সালের মার্চে সরকারের নির্বাহী সিদ্ধান্তে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি দেওয়া হয়। দীর্ঘ সময় তিনি চিকিৎসাধীন ও রাজনৈতিকভাবে সীমাবদ্ধ অবস্থায় ছিলেন।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাঁর মুক্তির পথ উন্মুক্ত হয়। পরবর্তীতে তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় দেশবাসীর উদ্দেশে বক্তব্য দেন। জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত তাঁর রাজনৈতিক উপস্থিতি ও জনসম্পৃক্ততা দেশের রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল।

তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের অবসান ঘটে। তাঁর মৃত্যুতে রাষ্ট্রীয়ভাবে শোক পালন করা হয় এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক মহল থেকে শোক প্রকাশ করা হয়। বিএনপিও দলীয়ভাবে শোক কর্মসূচি ঘোষণা করে।

বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন ছিল সংগ্রাম, সাফল্য, বিতর্ক, আন্দোলন ও প্রতিকূলতায় পরিপূর্ণ। তাঁকে কেউ দেখেছেন গণতন্ত্রের আপোষহীন নেত্রী হিসেবে, কেউ দেখেছেন একজন শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও বাংলাদেশের আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁর প্রভাব অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

তিনি ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। তিনবার সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেছেন। রাজপথের আন্দোলন থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা—দুই ক্ষেত্রেই তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ রেখে গেছেন।

আজ তাঁর জন্মদিনে দলীয় নেতা-কর্মীরা তাঁকে স্মরণ করছেন দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের মাধ্যমে। কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার শুধু একটি দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে। ইতিহাসের বিচারে বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনীতির এমন এক চরিত্র, যাঁকে বাদ দিয়ে দেশের গত কয়েক দশকের রাজনৈতিক ইতিহাস লেখা কঠিন।

আপোষহীন দেশনেত্রী, আপনার বিদায় আমাদের জন্য গভীর বেদনার। আপনার শূন্যতা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে আপনার নাম উচ্চারিত হবে নানা মূল্যায়ন ও আলোচনার মধ্য দিয়ে। রাজনৈতিক জীবনের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় আপনি যে অধ্যায় রচনা করে গেছেন, তা বাংলাদেশের ইতিহাসের পাতায় দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

আজ আপনার জন্মদিনে গভীর শ্রদ্ধায় আপনাকে স্মরণ করছি। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আপনার জীবনের সকল ভুলত্রুটি ক্ষমা করে আপনাকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মাকাম দান করুন। আমিন।

মঈনুল হাসান রতন
লেখক ও সাংবাদিক
সভাপতি, শায়েস্তাগঞ্জ প্রেসক্লাব, হবিগঞ্জ।