বৈশাখী মেলা ঘিরে মাটির জিনিসপত্র তৈরীতে ব্যস্ত শায়েস্তাগঞ্জের মৃৎশিল্পীরা
শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার সুরাবই (পালপাড়া) গ্রামে বাড়ির উঠুনে রোদে শুকানো হচ্ছে মাটির তৈরী নানা ধরনের জিনিসপত্র। আর বারান্দায় বসে এসব পন্য তৈরীর কাজ করছেন সুভাষ পাল। বিভিন্ন ধরণের মাটির জিনিসপত্র ও দই’র কাপ নিপুন হাতে তৈরী করছেন তিনি। রং তুলি আচর শেষে এসব পন্য যাবে বৈশাখি মেলায়। এছাড়া (৩য় পাতায় দেখুন) পড়াশুনার খরচ আর পরিবারের আর্থিক যোগান দিতে এ কাজে সহযোগিতা করছেন একই গ্রামের অনন্যা রানী পাল। শুধু সুভাষ ও অনন্যা নয়, পহেলা বৈশাখকে সামনে রেখে হাড়ি-পাতিল, মাটির ব্যাংক, কলস, দই’র কাপ, ঢাকনা, পুতুল, ঘোড়া, ষাড়সহ হরেক রকমের শিশুদের খেলনা তৈরীতে ব্যস্ত সময় পার করছেন পাল পাড়ার ২০টি পরিবারের মৃৎশিল্পীরা। এক সময়ে ওই গ্রামের শতাধিক পরিবার শিল্পের সাথে জড়িত থাকলেও এখন কাজ করছেন ২০/২৫ জন মৃৎশিল্পী। বছরজুড়ে কমবেশি এসব পণ্য তৈরি হলেও পহেলা বৈশাখকে ঘিরে বাড়ে ব্যস্ততা। এই সময়ে চাহিদা বাড়ায় তৈজসপত্রের সঙ্গে তৈরি হয় মাটির ব্যাংক, পুতুল, গরু-মহিষসহ নানা ধরনের খেলনা। সেগুলো বিক্রি হয় স্থানীয় বিভিন্ন বৈশাখী মেলায়। পহেলা বৈশাখকে ঘিরে পুরো চৈত্র মাস জুড়ে এসব জিনিস তৈরী করেন তারা। আর বৈশাখি মেলায় এসব পণ্য বিক্রি করে যে টাকা আয় করেন, সে টাকা সংসারের খরচ এবং সন্তানদের পড়াশুনায় ব্যয় করে থাকেন। তবে আধুনিক প্লাস্টিক ও অ্যালুমিনিয়াম পণ্যের ভিড়ে এবং কাঁচামাল (মাটি ও জ্বালানি) এর দাম বেড়ে যাওয়ায় এই শিল্পটি এখন অনেকটা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। শিল্পটি ধরে রাখতে সরকারের সহযোগিতা কামনা করেছেন মৃৎশিল্পীরা।
মৃৎশিল্পীরা জানান, পাইকারী এবং খুচরা দরে এসব পন্য বিক্রি করা হয়। খুচরা দরে এক জোড়া হাড়ি-পাতিল ৪০ থেকে ৫০ টাকা, মাটির ব্যাংক ২০ টাকা, কলস ২৫ টাকা, দই’র কাপ (প্রতি ডজন) ৫০ থেকে ৬০ টাকা, ঢাকনা ১০ থেকে ১৫ টাকা। এছাড়া শিশুদের খেলনা পুতুল ১০ থেকে ২০ টাকা, ঘোড়া ৩০ থেকে ৪০ ও ষাড় ৪০ থেকে ৫০ টাকা মূূল্যে বিক্রি করা হয়। তবে পাইকারী দরে প্রতিটি পণ্য ১০ থেকে ১৫ টাকা কমে বিক্রি করা হয়।
শিল্পীদের অভিযোগ, বাজারে প্লাষ্টিকের পন্য সয়লাব ও উপকরণের দাম বাড়ায় দিন দিন হারাতে বসেছে ঐতিহ্যবাহি শিল্পটি। এক সময়ে জেলার প্রত্যেকটি এলাকায় এর ব্যাপক চাহিদা ছিল। এখন গ্রামে গ্রামে হকার ঢুকে গেছে। তারা প্লাস্টিকের পন্য কম দামে বিক্রি করছে। ফলে চাহিদা কমছে মৃৎশিল্পের। তাছাড়া আধুনিকতার কারনে মাটির তৈরী হাড়ি-পাতিল ক্রয় করতে নারাজ সাধারণ মানুষ।
অনন্যা রানী পাল বলেন, ‘দৈনন্দিন কাজে ব্যবহারের জন্য প্রতিদিন এসব মাটির জিনিস তৈরী করা হয়। তবে বৈশাখ এসে শিশুদের খেলনার চাহিদা বাড়ে। পড়াশুনার পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতা করে থাকি। এতে আমার পরিবারের সংসারের খরচ ও আমরা ভাই-বোনের পড়াশুনার খরচও চলে’।
একই গ্রামের সুভাষ পাল বলেন, ‘বংশ পরম্পরায় আমরা মাটির জিনিস তৈরী করে আসছি। এক সময়ে এসব জিনিসপত্রের ব্যাপক চাহিদা ছিল। এখন প্লাস্টিকের জিনিসপত্রের কারণে আগের তুলনায় বিক্রি অনেকটাই কম’।
রবি পাল বলেন, ‘অন্যান্য মাসের তুলনায় বৈশাখকে সামনে রেখে কাজের চাপ বেশি। এখন জিনিসপত্র তৈরী করছি, দু’ এক দিনের মধ্যে রং বসিয়ে দিব,। পরশ পাল বলেন, এক সময়ে মাটির জিনিসপত্রের বেশ কদর ছিল। বাজারে প্লাস্টিকের পণ্যের চাহিদা বেশি থাকায় হারাতে বসেছে শিল্পটি। ঐতিহ্যবাহি শিল্পটি ধরে রাখতে সরকারের সহযোাগিতা প্রয়োজন’।
বিসিক হবিগঞ্জের সহকারী মহাব্যবস্থাপক মোঃ বিল্লাল হোসেন ভূইয়া বলেন, ‘ মৃৎশিল্প বাঙালির নিজস্ব শিল্প, সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের অংশ। এই এলাকার গ্রামগঞ্জে এর চাহিদার পাশাপাশি বেশ কদর রয়েছে। মাটির তৈরী এসব জিনিসপত্র তৈরীতে আধুনিকায়নে শিল্পীদের প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে। একই সাথে তালিকা তৈরী করে তাদের ঋণ প্রদানে সহযোগিতা করা হবে’।













