হবিগঞ্জে বেপরোয়া ট্রান্সফরমার চোরচক্র, সংকটে চা শিল্প
হবিগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন এলাকায় ট্রান্সফরমার চুরি ও ডাকাতি বর্তমানে এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। গত ২৮ মাসে জেলায় অন্তত ২৬৩টি ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনা ঘটেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে সংঘবদ্ধ এই চক্রটি দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে, যার সর্বশেষ শিকার হয়েছে মাধবপুরের নোয়াপাড়া চা বাগান।
প্রবল বৃষ্টির সুযোগ নিয়ে সোমবার দিবাগত রাত দেড়টার দিকে মাধবপুর উপজেলার নোয়াপাড়া চা বাগানে এক চাঞ্চল্যকর ডাকাতি সংঘটিত হয়।
ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী ১০-১২ জনের একটি মুখোশধারী দল সেচ পাম্প হাউজে জানালা দিয়ে আগুন নিক্ষেপ করে পাহারাদারদের বের হতে বাধ্য করে। পাহারাদার শিপেন ব্যানার্জি ও জ্যোতিষ তেলেঙ্গাকে হাত-পা বেঁধে তিনটি ট্রান্সফরমারের ভেতরের মূল্যবান কয়েল ও তামার তার লুট করা হয়। লুণ্ঠিত মালামালের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৭ লাখ টাকা।এমনকি প্রমাণের তথ্য নিশ্চিহ্ন করতে পাহারাদারদের মোবাইল ফোনও পুড়িয়ে দেয় বলেও জানা যায়।
প্রধান লক্ষ্যবস্তু চা বাগান
তথ্যমতে, চা বাগানগুলো এখন এই চক্রের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। গত ৯ মার্চ একই বাগান (নোয়াপাড়া) থেকে পাহারাদারদের বেঁধে ১২টি ট্রান্সফরমার লুট করা হয়। চুনারুঘাট উপজেলার দেউন্দি ও লালচান্দ চা বাগানেও একাধিকবার একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে।
হবিগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির তথ্যমতে, ২০২৫ সালে ২৫৫টি এবং চলতি বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত আরও বেশ কিছু চুরির ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
ট্রান্সফরমার চুরি করতে গিয়ে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে।
গত ২৫ মার্চ সদর উপজেলার গঙ্গানগরে চুরি করতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে জামাল মিয়া নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়। ২০২২ সালে আজমিরীগঞ্জে একইভাবে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে দুই যুবকের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল।
মূল ক্রেতা অসাধু ভাঙারি ব্যবসায়ীরা
স্থানীয় সূত্র ও বাগান কর্তৃপক্ষের অভিযোগ অনুযায়ী জেলার ৯টি উপজেলায় সক্রিয় অসাধু ভাঙারি ব্যবসায়ীরাই এই চুরিকৃত মালামালের মূল ক্রেতা।
বিভিন্ন সময় ডাকাত দলের সদস্যদের আটক করা হলেও তারা দ্রুত জামিনে বেরিয়ে এসে পুনরায় একই অপরাধে লিপ্ত হচ্ছে। থানাগুলোতে নিয়মিত মামলা ও অভিযোগ দায়ের করা হলেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি বা মালামাল উদ্ধারের নজির কম বলেও অভিযোগ করেন তারা।
উৎপাদন ঘাটতির মুখে পড়বে চা শিল্প
এ বিষয়ে হবিগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার মো. জিল্লুর রহমান বলেন, “চা বাগানগুলোতে যেভাবে পরিকল্পিতভাবে ট্রান্সফরমার চুরি হচ্ছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আমাদের চা শিল্প মারাত্মক উৎপাদন ঘাটতির মুখে পড়বে।”
মাধবপুর থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) গোলাম মোস্তফা জানিয়েছেন, নোয়াপাড়া চা বাগানের ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।
হবিগঞ্জের অর্থনৈতিক প্রাণশক্তি হিসেবে পরিচিত চা শিল্প আজ এক অদৃশ্য শত্রুর কবলে। জনমনে এখন একটাই প্রশ্ন—প্রশাসনের কঠোর নজরদারি ও অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থাগ্রহণ কি এই চক্রের দৌরাত্ম্য থামাতে পারবে।


















