ঢাকা ০৭:০০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ২২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo হবিগঞ্জে মোবাইল চুরি নিয়ে দুই গ্রামের সংঘর্ষ, আহত শতাধিক Logo ৭ই নভেম্বর ও একজন দেশপ্রেমিক জিয়াউর রহমান Logo হবিগঞ্জের দেড়শ বছরের পুরোনো রাসবিহারী সাহার বাড়ি ধ্বংসের পথে Logo চুনারুঘাটে অভিযানে বালু উত্তোলনের মেশিন-পাইপ ধ্বংস Logo শিক্ষার মানোন্নয়নে বিদ্যালয়ে তদারকি জোরদার করা হবে : হবিগঞ্জে ববি হাজ্জাজ Logo হত্যার ৩ বছর পর সেপটিক ট্যাংক থেকে প্রবাসীর দেহাবশেষ উদ্ধার, গ্রেপ্তার ৪ Logo তিন সপ্তাহ ধরে মজুরি বন্ধ, বিপাকে ৪ চা বাগানের শ্রমিকেরা Logo বাহুবলে পিকআপ-কাভার্ড ভ্যানের সংঘর্ষে শ্রমিক নিহত, আহত ৪ Logo ট্রেনের শেষ বগীর পেছনেই ৩৫ বছরের জীবন Logo চুনারুঘাটে কালের আবর্তে হারিয়ে যাচ্ছে গরু দিয়ে জমি চাষ

৭ই নভেম্বর ও একজন দেশপ্রেমিক জিয়াউর রহমান

মঈনুল হাসান রতন

৭ই নভেম্বর বাংলাদেশের জাতীয় জীবনে এক ঐতিহাসিক ও তাৎপর্যপূর্ণ দিন। জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে দিনটি দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা করে। সেই ঘটনাপ্রবাহের কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান।
১৯৭৫ সালের ৩ থেকে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত সময়টি ছিল বাংলাদেশের জন্য এক চরম অনিশ্চয়তা ও রাজনৈতিক অস্থিরতার অধ্যায়। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পালাবদল, সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা এবং রাজনৈতিক সংকটের কারণে গোটা দেশ এক গভীর উদ্বেগের মধ্যে পড়ে। এ সময় দেশের মানুষের কাছে আস্থার প্রতীক হিসেবে পরিচিত জিয়াউর রহমানকে বন্দি করে রাখা হয়। পরবর্তী সময়ে সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তিনি মুক্ত হন।
৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহে সিপাহী ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে আছে। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা, রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা এবং অনিশ্চয়তা থেকে দেশকে উত্তরণের আকাক্সক্ষা এ ঘটনাকে বিশেষ তাৎপর্য দিয়েছিল। জিয়াউর রহমানকে কেন্দ্র করে সেদিনের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়।
সেদিনের ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ, সিপাহী-জনতার মিছিল, স্লোগান এবং পারস্পরিক সংহতির স্মৃতি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আজও আলোচিত। রাজধানী ঢাকার রাজপথে সিপাহী ও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে যে অভূতপূর্ব দৃশ্যের সৃষ্টি হয়েছিল, তা ছিল তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন। জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা পরবর্তী সময়ে দেশের রাজনীতিতে নতুন ধারার জন্ম দেয়।
জাতির সেই সংকটময় সময়ে জিয়াউর রহমান দেশবাসীর উদ্দেশে ঐক্য, শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান। তাঁর রাজনৈতিক দর্শনে জাতীয় ঐক্য, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব এবং অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল। পরবর্তী সময়ে তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়, যা দেশের অর্থনীতি ও গ্রামীণ সমাজে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।
দেশপ্রেমই ছিল রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। তিনি মনে করতেন, সাময়িক শাসনব্যবস্থা কখনো স্থায়ী সমাধান হতে পারে না; জনগণের অংশগ্রহণমূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাই রাষ্ট্র পরিচালনার কার্যকর ভিত্তি। তাঁর শাসনামলে বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক মত ও আদর্শের মানুষের জন্য রাজনীতিতে অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক অধিকার এবং গণতান্ত্রিক চর্চার বিষয়গুলোও তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্যে গুরুত্ব পায়।
জিয়াউর রহমান শুধু একজন মুক্তিযোদ্ধা কিংবা সামরিক কর্মকর্তা ছিলেন না; অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা বাংলাদেশের ইতিহাসে আলোচিত। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, খাল খনন কর্মসূচি, গ্রামীণ উন্নয়ন, জনশক্তি রপ্তানি এবং স্বনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার মতো বিভিন্ন উদ্যোগ তাঁর শাসনামলে গুরুত্ব পায়। উন্নয়ন ও উৎপাদনমুখী রাজনীতির মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি আত্মনির্ভরশীল রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি।
জিয়াউর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একজন গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত ব্যক্তিত্ব। স্বল্প সময়ের রাজনৈতিক জীবনে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক সংগঠন গঠনের ক্ষেত্রে নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর চিন্তা ও কর্মসূচির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে একটি আধুনিক, উৎপাদনমুখী ও স্বনির্ভর রাষ্ট্রে পরিণত করার প্রত্যাশা প্রকাশ পেয়েছিল।
১৯৭৬ সালের ২৮ জুলাই রাজনৈতিক দলবিধি জারির মাধ্যমে দেশে রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রম পরিচালনার একটি নতুন কাঠামো তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে আহ্বায়ক করে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল (জাগদল) গঠিত হয়। তৎকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতা ও জাতীয়তাবাদী আদর্শে বিশ্বাসী বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে ঐক্যবদ্ধ করার প্রয়োজনীয়তা থেকেই নতুন রাজনৈতিক দলের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর ঢাকার রমনা রেস্তোরাঁয় এক সংবাদ সম্মেলনে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং জাতীয় ঐক্যের ধারণাকে সামনে রেখে দলটির যাত্রা শুরু হয়। উন্নয়ন ও উৎপাদনের রাজনীতিকে প্রাধান্য দিয়ে বিএনপি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি নতুন ধারার সূচনা করে।
১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের পর জিয়াউর রহমান রাষ্ট্র পরিচালনায় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করে। এই নির্বাচন বাংলাদেশের সংসদীয় ও রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হিসেবে বিবেচিত।
মহান মুক্তিযুদ্ধে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা বাংলাদেশের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে তাঁর স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়। তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং সেক্টর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর এই ভূমিকা তাঁকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে গেছে।
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম ভিত্তি ছিল বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। তিনি মনে করতেন, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা, জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করতে হলে একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রয়োজন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিএনপি আজও বাংলাদেশে একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দল হিসেবে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রেখেছে।
গণতন্ত্র, জাতীয় ঐক্য, উন্নয়ন ও উৎপাদনমুখী অর্থনীতির যে ধারণা তিনি সামনে এনেছিলেন, তা তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁর সমর্থকদের কাছে তিনি ছিলেন গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতির অন্যতম পথিকৃৎ। তাঁর প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল বিএনপি বাংলাদেশের ঘটনাবহুল রাজনৈতিক ইতিহাসে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করেছে।
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক জীবনের নানা দিক নিয়ে আলোচনা থাকলেও বাংলাদেশের স্বাধীনতা, রাষ্ট্রগঠন, রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের ইতিহাসে তাঁর ভূমিকা বিশেষভাবে আলোচিত। তিনি তাঁর কর্ম ও রাজনৈতিক দর্শনের মাধ্যমে দেশের মানুষের একটি অংশের কাছে গভীর জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন।
পরিশেষে বলা যায়, ৭ই নভেম্বর শুধু একটি তারিখ নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই দিনের ঘটনাপ্রবাহ, সিপাহী-জনতার অংশগ্রহণ এবং জিয়াউর রহমানের পরবর্তী রাজনৈতিক ভূমিকা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক বিকাশের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে। ইতিহাসের মূল্যায়ন করতে হলে আবেগের পাশাপাশি তথ্য, যুক্তি ও নিরপেক্ষ বিশ্লেষণও প্রয়োজন। তবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, জাতীয় ঐক্য ও উন্নয়নের প্রশ্নে জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার যে দীর্ঘদিন আলোচনায় থাকবে, তা নিঃসন্দেহে বলা যায়।
মঈনুল হাসান রতন
লেখক ও সাংবাদিক
সভাপতি, শায়েস্তাগঞ্জ প্রেসক্লাব।
সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক জাসাস হবিগঞ্জ জেলা

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপডেট সময় ০৫:০০:৫৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬
৫ বার পড়া হয়েছে

৭ই নভেম্বর ও একজন দেশপ্রেমিক জিয়াউর রহমান

আপডেট সময় ০৫:০০:৫৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬

৭ই নভেম্বর বাংলাদেশের জাতীয় জীবনে এক ঐতিহাসিক ও তাৎপর্যপূর্ণ দিন। জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে দিনটি দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা করে। সেই ঘটনাপ্রবাহের কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান।
১৯৭৫ সালের ৩ থেকে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত সময়টি ছিল বাংলাদেশের জন্য এক চরম অনিশ্চয়তা ও রাজনৈতিক অস্থিরতার অধ্যায়। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পালাবদল, সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা এবং রাজনৈতিক সংকটের কারণে গোটা দেশ এক গভীর উদ্বেগের মধ্যে পড়ে। এ সময় দেশের মানুষের কাছে আস্থার প্রতীক হিসেবে পরিচিত জিয়াউর রহমানকে বন্দি করে রাখা হয়। পরবর্তী সময়ে সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তিনি মুক্ত হন।
৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহে সিপাহী ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে আছে। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা, রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা এবং অনিশ্চয়তা থেকে দেশকে উত্তরণের আকাক্সক্ষা এ ঘটনাকে বিশেষ তাৎপর্য দিয়েছিল। জিয়াউর রহমানকে কেন্দ্র করে সেদিনের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়।
সেদিনের ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ, সিপাহী-জনতার মিছিল, স্লোগান এবং পারস্পরিক সংহতির স্মৃতি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আজও আলোচিত। রাজধানী ঢাকার রাজপথে সিপাহী ও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে যে অভূতপূর্ব দৃশ্যের সৃষ্টি হয়েছিল, তা ছিল তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন। জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা পরবর্তী সময়ে দেশের রাজনীতিতে নতুন ধারার জন্ম দেয়।
জাতির সেই সংকটময় সময়ে জিয়াউর রহমান দেশবাসীর উদ্দেশে ঐক্য, শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান। তাঁর রাজনৈতিক দর্শনে জাতীয় ঐক্য, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব এবং অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল। পরবর্তী সময়ে তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়, যা দেশের অর্থনীতি ও গ্রামীণ সমাজে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।
দেশপ্রেমই ছিল রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। তিনি মনে করতেন, সাময়িক শাসনব্যবস্থা কখনো স্থায়ী সমাধান হতে পারে না; জনগণের অংশগ্রহণমূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাই রাষ্ট্র পরিচালনার কার্যকর ভিত্তি। তাঁর শাসনামলে বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক মত ও আদর্শের মানুষের জন্য রাজনীতিতে অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক অধিকার এবং গণতান্ত্রিক চর্চার বিষয়গুলোও তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্যে গুরুত্ব পায়।
জিয়াউর রহমান শুধু একজন মুক্তিযোদ্ধা কিংবা সামরিক কর্মকর্তা ছিলেন না; অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা বাংলাদেশের ইতিহাসে আলোচিত। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, খাল খনন কর্মসূচি, গ্রামীণ উন্নয়ন, জনশক্তি রপ্তানি এবং স্বনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার মতো বিভিন্ন উদ্যোগ তাঁর শাসনামলে গুরুত্ব পায়। উন্নয়ন ও উৎপাদনমুখী রাজনীতির মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি আত্মনির্ভরশীল রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি।
জিয়াউর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একজন গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত ব্যক্তিত্ব। স্বল্প সময়ের রাজনৈতিক জীবনে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক সংগঠন গঠনের ক্ষেত্রে নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর চিন্তা ও কর্মসূচির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে একটি আধুনিক, উৎপাদনমুখী ও স্বনির্ভর রাষ্ট্রে পরিণত করার প্রত্যাশা প্রকাশ পেয়েছিল।
১৯৭৬ সালের ২৮ জুলাই রাজনৈতিক দলবিধি জারির মাধ্যমে দেশে রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রম পরিচালনার একটি নতুন কাঠামো তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে আহ্বায়ক করে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল (জাগদল) গঠিত হয়। তৎকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতা ও জাতীয়তাবাদী আদর্শে বিশ্বাসী বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে ঐক্যবদ্ধ করার প্রয়োজনীয়তা থেকেই নতুন রাজনৈতিক দলের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর ঢাকার রমনা রেস্তোরাঁয় এক সংবাদ সম্মেলনে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং জাতীয় ঐক্যের ধারণাকে সামনে রেখে দলটির যাত্রা শুরু হয়। উন্নয়ন ও উৎপাদনের রাজনীতিকে প্রাধান্য দিয়ে বিএনপি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি নতুন ধারার সূচনা করে।
১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের পর জিয়াউর রহমান রাষ্ট্র পরিচালনায় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করে। এই নির্বাচন বাংলাদেশের সংসদীয় ও রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হিসেবে বিবেচিত।
মহান মুক্তিযুদ্ধে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা বাংলাদেশের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে তাঁর স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়। তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং সেক্টর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর এই ভূমিকা তাঁকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে গেছে।
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম ভিত্তি ছিল বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। তিনি মনে করতেন, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা, জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করতে হলে একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রয়োজন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিএনপি আজও বাংলাদেশে একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দল হিসেবে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রেখেছে।
গণতন্ত্র, জাতীয় ঐক্য, উন্নয়ন ও উৎপাদনমুখী অর্থনীতির যে ধারণা তিনি সামনে এনেছিলেন, তা তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁর সমর্থকদের কাছে তিনি ছিলেন গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতির অন্যতম পথিকৃৎ। তাঁর প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল বিএনপি বাংলাদেশের ঘটনাবহুল রাজনৈতিক ইতিহাসে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করেছে।
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক জীবনের নানা দিক নিয়ে আলোচনা থাকলেও বাংলাদেশের স্বাধীনতা, রাষ্ট্রগঠন, রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের ইতিহাসে তাঁর ভূমিকা বিশেষভাবে আলোচিত। তিনি তাঁর কর্ম ও রাজনৈতিক দর্শনের মাধ্যমে দেশের মানুষের একটি অংশের কাছে গভীর জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন।
পরিশেষে বলা যায়, ৭ই নভেম্বর শুধু একটি তারিখ নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই দিনের ঘটনাপ্রবাহ, সিপাহী-জনতার অংশগ্রহণ এবং জিয়াউর রহমানের পরবর্তী রাজনৈতিক ভূমিকা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক বিকাশের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে। ইতিহাসের মূল্যায়ন করতে হলে আবেগের পাশাপাশি তথ্য, যুক্তি ও নিরপেক্ষ বিশ্লেষণও প্রয়োজন। তবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, জাতীয় ঐক্য ও উন্নয়নের প্রশ্নে জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার যে দীর্ঘদিন আলোচনায় থাকবে, তা নিঃসন্দেহে বলা যায়।
মঈনুল হাসান রতন
লেখক ও সাংবাদিক
সভাপতি, শায়েস্তাগঞ্জ প্রেসক্লাব।
সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক জাসাস হবিগঞ্জ জেলা