শায়েস্তাগঞ্জ জংশনে নেই নলকূপ, তৃষ্ণার্ত যাত্রীদের হাহাকার
হবিগঞ্জ জেলার অন্যতম ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ রেলওয়ে জংশন শায়েস্তাগঞ্জ। প্রতিদিন ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত আন্তঃনগর, মেইল ও লোকাল ট্রেনের যাত্রীদের পদচারণায় মুখর থাকে এই জংশন। ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাতায়াতের জন্য প্রতিদিন শত শত মানুষ এ জংশন ব্যবহার করেন। কর্মজীবী, শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, রোগী, পর্যটক থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে শায়েস্তাগঞ্জ রেলওয়ে জংশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগকেন্দ্র।
কিন্তু এত গুরুত্বপূর্ণ এই রেলওয়ে জংশনে যাত্রীদের জন্য রয়েছে মৌলিক একটি সুবিধার বড় ঘাটতি। জংশন চত্বরে নেই পর্যাপ্ত নলকূপ কিংবা সহজলভ্য নিরাপদ সুপেয় পানির ব্যবস্থা। ফলে তীব্র গরমে তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়া যাত্রীদের বাধ্য হয়ে দোকান থেকে টাকা দিয়ে বোতলজাত পানি কিনে পান করতে হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন যাত্রীদের বাড়তি অর্থ ব্যয় হচ্ছে, অন্যদিকে জরুরি মুহূর্তে সহজে পানি না পাওয়ায় তৈরি হচ্ছে চরম দুর্ভোগ।
বর্তমানে প্রচণ্ড গরমে এই সংকট আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। দূর-দূরান্ত থেকে আসা অনেক যাত্রী ট্রেন ছাড়ার নির্ধারিত সময়ের আগেই জংশনে পৌঁছে যান। আবার কখনো ট্রেন বিলম্বিত হলে দীর্ঘ সময় প্ল্যাটফর্মে অপেক্ষা করতে হয়। এ সময় তৃষ্ণা পেলেও জংশনের ভেতরে বিনামূল্যে বা সহজলভ্য পানির কোনো ব্যবস্থা না থাকায় তাদের দোকানের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
যাত্রীদের অভিযোগ, একটি গুরুত্বপূর্ণ রেলওয়ে জংশনে অন্তত একটি কার্যকর নলকূপ থাকা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু শায়েস্তাগঞ্জ রেলওয়ে জংশনে সেই মৌলিক সুবিধাটুকুও না থাকায় প্রতিদিন অসংখ্য যাত্রীকে বোতলজাত পানি কিনতে হচ্ছে।
যাত্রী সুজন মিয়া বলেন, “জংশনে একটি নলকূপ থাকলে খুব সহজেই পানি পান করা যেত। কিন্তু নলকূপ না থাকায় তৃষ্ণা পেলেই পানি কিনতে হয়। একা হলে সমস্যা কম, কিন্তু পরিবারের কয়েকজন সদস্য নিয়ে যাতায়াত করলে পানির পেছনে বাড়তি টাকা খরচ হয়।”
অন্য আরেক যাত্রী সজল মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “ট্রেনে ভ্রমণের জন্য টাকা দিয়ে টিকিট কাটতে হয়। যাত্রীদের জন্য জংশন স্থাপন করা হয়েছে। অথচ যাত্রীদের জন্য বিশুদ্ধ পানির মতো মৌলিক একটি সুবিধা থাকবে না—এটা মেনে নেওয়া কঠিন। বিশেষ করে গরমের সময় সমস্যাটি বেশি অনুভূত হয়।”
শুধু সাধারণ যাত্রীই নন, শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ যাত্রীরাও পড়ছেন বেশি বিড়ম্বনায়। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ট্রেনে ভ্রমণের সময় শিশুদের ঘন ঘন পানির প্রয়োজন হয়। কিন্তু স্টেশনে নলকূপ না থাকায় অভিভাবকদের প্রতিবারই দোকান থেকে পানি কিনে দিতে হচ্ছে।
একইভাবে বয়স্ক ও অসুস্থ যাত্রীদের ক্ষেত্রেও পানির প্রয়োজনীয়তা বেশি। দূরপাল্লার যাত্রার আগে কিংবা পরে জংশনে অবস্থানকালে তারা তৃষ্ণার্ত হলে সহজে পানি পাওয়ার সুযোগ না থাকায় সমস্যায় পড়েন। বিশেষ করে অসুস্থ রোগী নিয়ে যারা ট্রেনে যাতায়াত করেন, তাদের জন্য এ সংকট আরও ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, শায়েস্তাগঞ্জ রেলওয়ে জংশনে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষের যাতায়াত। তাই শুধু একটি নলকূপ স্থাপন করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না। নলকূপের পানি নিরাপদ কি না, সেটিও নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ, রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচ্ছন্নতার বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) জেলা কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট মনসুর উদ্দিন আহমেদ ইকবাল বলেন, শায়েস্তাগঞ্জ রেলওয়ে জংশন জেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রেল যোগাযোগকেন্দ্র। এ জংশন ব্যবহার করে প্রতিদিন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ দেশের বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করেন। শুধু শায়েস্তাগঞ্জ নয়, জেলার বিভিন্ন উপজেলা এবং আশপাশের এলাকার মানুষও এ জংশনের ওপর নির্ভরশীল। এত গুরুত্বপূর্ণ একটি জংশনে যাত্রীদের জন্য পানির ব্যবস্থা না থাকায় যাত্রীসেবার মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। আধুনিক যুগে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি যাত্রীদের মৌলিক সুবিধাগুলো নিশ্চিত করা জরুরি।
ট্রেনযাত্রী শাহেনা আক্তার, পারভীন চৌধুরী, হাসান মিয়া ও শিপন মিয়া বলেন, রেলওয়ে জংশনে অপেক্ষাকক্ষ, প্ল্যাটফর্ম, বসার ব্যবস্থা, আলো-বাতাস, পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তার পাশাপাশি বিশুদ্ধ খাবার পানি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুবিধাগুলোর একটি। অথচ দীর্ঘদিন ধরে এ বিষয়টি অবহেলিত থাকা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
তাদের মতে, জংশনে পানির ব্যবস্থা না থাকায় তৃষ্ণার্ত যাত্রীদের অনেকেরই একমাত্র ভরসা বোতলজাত পানি। গরমের সময় যাত্রী সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পানির চাহিদাও বেড়ে যায়। তখন দোকান থেকে পানি সংগ্রহ করতে গিয়ে অনেক সময় যাত্রীদের ভিড়ের মধ্যেও বিড়ম্বনায় পড়তে হয়।
তাদের প্রশ্ন, “একটি রেলওয়ে জংশনে যেখানে প্রতিদিন শত শত মানুষ যাতায়াত করেন, সেখানে কেন একটি নিরাপদ পানির উৎস থাকবে না?”
স্থানীয়দের দাবি, জংশনের প্ল্যাটফর্ম ও যাত্রীদের চলাচলের সুবিধাজনক স্থানে একাধিক নলকূপ স্থাপন করা হলে এ দুর্ভোগ অনেকটাই কমবে। একই সঙ্গে বোতলজাত পানির ওপর নির্ভরশীলতাও কমবে। তবে নলকূপ স্থাপনের পাশাপাশি পানির মান নিয়মিত পরীক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
দেউন্দি প্রতীক থিয়েটারের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আমোদ মাল বলেন, শায়েস্তাগঞ্জ রেলওয়ে জংশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি জংশনে পানির সংকটের বিষয়টি দ্রুত সমাধান করা প্রয়োজন। রেলপথে যাত্রী পরিবহন শুধু এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পৌঁছে দেওয়ার বিষয় নয়; যাত্রাপথে মানুষের মৌলিক সুবিধা ও স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করাও কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। তাই পানির মতো মৌলিক একটি বিষয়ে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
শায়েস্তাগঞ্জের ডা. এম এ মোতালিব বলেন, প্রতিদিনের অসংখ্য যাত্রীর দুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে শায়েস্তাগঞ্জ রেলওয়ে জংশনে দ্রুত নলকূপ স্থাপন এবং বিশুদ্ধ পানির স্থায়ী ব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবি। তীব্র গরমে ট্রেনের অপেক্ষায় থাকা তৃষ্ণার্ত মানুষের হাতে যখন পানির বোতল, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, ‘এই গুরুত্বপূর্ণ রেলওয়ে জংশনে যাত্রীদের জন্য এক গ্লাস নিরাপদ পানির ব্যবস্থা কি এতটাই কঠিন?’
তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত ও কার্যকর উদ্যোগই পারে দীর্ঘদিনের এই ভোগান্তির অবসান ঘটাতে। গরমের মৌসুমে পানির সংকট আরও তীব্র হওয়ার আগেই জংশনে পর্যাপ্তসংখ্যক নলকূপ স্থাপন এবং নিরাপদ পানির স্থায়ী ব্যবস্থা করা জরুরি।
এদিকে শায়েস্তাগঞ্জ রেলওয়ে জংশনের স্টেশন মাস্টার লিটন চন্দ্র দে বলেন, ‘স্টেশনে গভীর নলকূপ নেই। এ বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।’
স্টেশন মাস্টারের এ বক্তব্যে বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে থাকার বিষয়টি স্পষ্ট হলেও, কবে নাগাদ নলকূপ স্থাপন বা নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করা হবে—তা এখনও নিশ্চিত নয়। ফলে প্রতিদিনের মতোই তৃষ্ণার্ত যাত্রীদের বোতলজাত পানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
যাত্রীদের দাবি, শায়েস্তাগঞ্জ রেলওয়ে জংশনের গুরুত্ব বিবেচনা করে বিষয়টি আর ফাইলবন্দি বা আশ্বাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দ্রুত বাস্তবায়ন করা হোক। প্ল্যাটফর্মের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নলকূপ স্থাপনের পাশাপাশি বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করা হলে যাত্রীদের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ অনেকটাই কমবে।












