আন্দোলন-সংগ্রামের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে সংসদীয় কমিটির সভাপতি জি কে গউছ
দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা, আন্দোলন-সংগ্রাম, মামলা-হামলা ও নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে জাতীয় সংসদের গুরুত্বপূর্ণ একটি সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পেলেন হবিগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ আলহাজ্ব জি কে গউছ।
তিনি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মণির প্রস্তাবক্রমে কণ্ঠভোটে এ কমিটি গঠন করা হয়।
গুরুত্বপূর্ণ এই দায়িত্ব পাওয়ার মধ্য দিয়ে জাতীয় সংসদে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে জি কে গউছের ভূমিকা রাখার নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। পরিবেশ সংরক্ষণ, বনসম্পদ রক্ষা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সরকারের নীতি ও কার্যক্রম পর্যালোচনায় সংসদীয় এই কমিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত জি কে গউছের রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় ছাত্ররাজনীতির মাধ্যমে। পরবর্তীতে যুবদল, জেলা বিএনপি থেকে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে দলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
১৯৬৮ সালের ২০ এপ্রিল হবিগঞ্জ শহরের শায়েস্তানগর এলাকায় এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন জি কে গউছ। তার পিতা বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মরহুম আলহাজ্ব গোলাম মর্তুজা লাল মিয়া এবং মাতা মরহুমা আলহাজ্ব মঞ্জিলা বেগম।
১৯৮৪ সালে এসএসসি পাস করে হবিগঞ্জ বৃন্দাবন সরকারি কলেজে ভর্তি হন তিনি। একই কলেজ থেকে বিএ পাস করেন। কলেজে ভর্তি হওয়ার পরপরই জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের রাজনীতিতে যুক্ত হন এবং কলেজ শাখার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান। পরবর্তীতে বৃন্দাবন সরকারি কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি নির্বাচিত হন।
১৯৮৭ সালে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল হবিগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন জি কে গউছ। এরপর ১৯৯৪ সালে হবিগঞ্জ পৌর যুবদলের সভাপতি, ১৯৯৫ সালে জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক এবং ১৯৯৬ সালে যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে হবিগঞ্জ জেলা যুবদলের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ২০০৩ সালে যুবদলের কেন্দ্রীয় সহ-সমবায় বিষয়ক সম্পাদক নির্বাচিত হন।
২০০৪ সালে হবিগঞ্জ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন জি কে গউছ। ২০১১ সালে দ্বিতীয়বারের মতো একই পদে মনোনীত হন তিনি। পরে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং ২০১৬ সালে জাতীয় নির্বাহী কমিটির সমবায় বিষয়ক সম্পাদক মনোনীত হন। ২০২৪ সালে বিএনপির সিলেট বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পান তিনি।
দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমের পাশাপাশি রাজপথের বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামেও সক্রিয় ছিলেন জি কে গউছ। রাজনৈতিক জীবনে নানা প্রতিকূলতা ও ঘাত-প্রতিঘাতের মুখোমুখি হয়েছেন তিনি। বিভিন্ন রাজনৈতিক মামলায় আসামি হয়ে দীর্ঘ সময় কারাভোগও করতে হয়েছে তাকে। মোট ১ হাজার ৫১৭ দিন কারাগারে ছিলেন বলে জানা গেছে।
কারাগারে থাকাকালীনও তার রাজনৈতিক কর্মকান্ড থেমে থাকেনি। সমর্থকদের কাছে তিনি দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের একজন পরিচিত মুখ। রাজপথের কর্মসূচি থেকে কারাগার-বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্যেও রাজনৈতিক কর্মকান্ড চালিয়ে গেছেন বলে তার অনুসারীদের দাবি।
রাজনীতির পাশাপাশি স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাপনাতেও রয়েছে জি কে গউছের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। ২০০৪ সালে তিনি হবিগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ২০১১ সালে দ্বিতীয়বারের মতো মেয়র নির্বাচিত হন। এরপর ২০১৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর কারাগারে থাকা অবস্থায় নির্বাচনে অংশ নিয়ে টানা তৃতীয়বারের মতো হবিগঞ্জ পৌরসভার মেয়র নির্বাচিত হন তিনি।
স্থানীয় সরকারে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা এবং জাতীয় রাজনীতিতে দীর্ঘ পথচলার পর এবার জাতীয় সংসদের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পেলেন জি কে গউছ।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি হিসেবে এখন জাতীয় পর্যায়ে পরিবেশ ও জলবায়ু ইস্যুতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ তৈরি হয়েছে তার সামনে।
হবিগঞ্জের স্থানীয় রাজনীতি থেকে জাতীয় সংসদ-দীর্ঘ ৪২ বছরের রাজনৈতিক পথচলায় জি কে গউছের ক্যারিয়ারে যুক্ত হলো আরও একটি নতুন অধ্যায়। গুরুত্বপূর্ণ এই দায়িত্ব পাওয়ায় হবিগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে ইতোমধ্যে আলোচনা ও আগ্রহ তৈরি হয়েছে। সমর্থকদের প্রত্যাশা, নতুন দায়িত্বে তিনি জাতীয় সংসদে হবিগঞ্জের পাশাপাশি দেশের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু সুরক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখবেন।














