ঢাকা ০৯:০৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬, ৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo সৌদি আরবে প্রাইভেট কারের চাপায় শায়েস্তাগঞ্জের যুবক নিহত, পরিবারে মাতম Logo ‘অভাব তো বয়স বোঝে না, পেট তো খাবার চায়’ Logo আজমিরীগঞ্জে ২১ ঘণ্টা পর নদীতে ভাসল নিখোঁজ গৃহবধূর মরদেহ Logo শায়েস্তাগঞ্জে জয়ন্তিকা ট্রেনের ইঞ্জিনে আগুন, যাত্রীদের দুর্ভোগ Logo ‘পেনশন নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারবেন না’— পুলিশ কর্মকর্তাদেরকে হবিগঞ্জের মাধবপুরে ছাত্রলীগ নেতার হুঁশিয়ারি Logo হবিগঞ্জে সীমান্তবর্তী পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় ১২ প্লাটুন বিজিবি Logo হবিগঞ্জ কারাগারে আসামির মৃত্যু, হত্যার অভিযোগ পরিবারের Logo হবিগঞ্জ জেলা পরিষদের উদ্যোগে শায়েস্তাগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে বৃক্ষরোপণ প্রধানমন্ত্রীর ৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ ভিশন বাস্তবায়নে আমরা বদ্ধপরিকর: আহমেদ আলী মুকিব Logo বাহুবলে পানিতে ডুবে হবিগঞ্জের জনপ্রিয় ক্ষুদে কনটেন্ট ক্রিয়েটর দ্বীপের মৃত্যু Logo শায়েস্তাগঞ্জের অলিপুরে মহাসড়কের পাশে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে ইউএনওর অভিযান

৩০ হাজার মানুষকে ঘরছাড়া করে শান্ত হলো খোয়াই নদী

হবিগঞ্জ প্রতিনিধি:-

খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের ছয় হাজার পরিবারের প্রায় ৩০ হাজার মানুষ ভিটেমাটি ছাড়ার পর ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ ও বাঁধ মেরামতে নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। অথচ কয়েক বছর ধরেই ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ নিয়ে স্থানীয়দের আতঙ্ক ছিল। সময়মতো ব্যবস্থা না নেওয়ার খেসারত হিসেবে এবার নেমে এসেছে মানবিক বিপর্যয়।

গতকাল শনিবার বিকেল পর্যন্ত পানি নামতে শুরু করায় আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা মানুষ ঘরে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ক্ষতিগ্রস্ত নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোর সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ—কোনোমতে আবার নিজের ভিটায় ফেরা।

এর আগে গত বৃহস্পতিবার রাতে কালীগঞ্জ এলাকায় বাঁধ ভেঙে পাহাড়ি ঢলের পানি লোকালয়ে ঢুকে পুরো ইউনিয়ন প্লাবিত হয়।হবিগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আবু জাহের বলেন, ২৫ গ্রামের ছয় হাজার পরিবারের ৩০ হাজার মানুষ বন্যাকবলিত হয়েছেন। কেউ ইউনিয়ন পরিষদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ইটভাটাসহ বিভিন্ন স্থাপনা প্লাবিত হয়েছে। এখন পানি নামছে। কৃষি, প্রাণিসম্পদ ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, পুরুষরা ঘরবাড়ি পরিষ্কার ও মালামাল রক্ষায় ব্যস্ত, আর নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছেন।

ইউনিয়ন পরিষদের বারান্দায় পক্ষাঘাতগ্রস্ত ছেলে আব্দুল আজিজকে নিয়ে আশ্রয় নেওয়া ৮০ বছরের সৈয়দা বানু বলেন, বাড়ির পানি পুরোপুরি নামেনি। স্বামী ঘর পরিষ্কার করছেন। দুই দিনে সরকারি কোনো সহায়তা পাননি; আত্মীয়ের পাঠানো খাবারেই দিন কেটেছে।

রিনা বেগম, আব্দুল হামিদ, আমীর আলীসহ ১০টি পরিবার ইউনিয়ন পরিষদে আশ্রয় নিয়েছে। তাঁদের ভাষ্য, ঘর থেকে কিছুই বের করতে পারেননি। প্রথম ২৪ ঘণ্টা রান্নার ব্যবস্থা না থাকায় শিশুদের খাওয়াতে পারেননি। পরে স্থানীয় এক বাড়িতে রান্না করে খাবারের ব্যবস্থা হয়। কান্নাজড়িত কণ্ঠে রিনা বেগম বলেন, “ছবি তুইল্যা কিতা করতায় রে ভাই। আমরার পেটে তো ভাত নাই। পারলে সরকাররে কইয়া সাহায্যের ব্যবস্থা কইরা দেও।”

শাহজালাল উচ্চবিদ্যালয়েও প্রায় ২০টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। রিকশাচালক নুরুল আমীনের দুই শিশুর শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত ভাত জোটেনি। ধার করে গ্যাস সিলিন্ডার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনে খাবারের ব্যবস্থা করেন। চুনারুঘাট ভূমি অফিসের কর্মচারী আমীর আলী বলেন, “বেতনের টাকায় সংসার চালাই। অন্তত পাঁচ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। কীভাবে সামাল দেব বুঝতে পারছি না।”

সরকারি হিসাব না হলেও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ধারণা, ঘরবাড়ি, ফসল ও মালামাল মিলিয়ে ক্ষতির পরিমাণ কয়েকশ কোটি টাকা।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যে দেখা যায়, ২০১৭ সালে খোয়াই নদীর পানি বিপৎসীমার ২৮২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে গেলেও বাঁধ ভাঙেনি। এবার ২২১ সেন্টিমিটারেই বাঁধ ভেঙেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অবাধে বালু ও মাটি উত্তোলনের কারণে নদীর ধারণক্ষমতা কমে যাওয়ায় আগের তুলনায় ৬১ সেন্টিমিটার কম পানিতেই এ বিপর্যয় ঘটেছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের হবিগঞ্জ শাখার সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী হারুন বলেন, বালু উত্তোলন ও বাঁধে অবৈধ বসতি নিয়ে বহুদিনের সতর্কতা উপেক্ষা করা হয়েছে। বালু উত্তোলন বন্ধ এবং বাঁধ শক্তিশালী করার তেমন কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান ছিল না। এবার তার ফল হিসেবে মানবিক বিপর্যয় ঘটেছে।
হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সায়েদুর রহমান বলেন, বাম তীরে ২১ কোটি টাকায় ২৩ কিলোমিটার বাঁধের কাজ চললেও ডান তীরের অংশটি দীর্ঘদিন সংস্কার করা হয়নি। এখন ব্লক সংগ্রহ করা হয়েছে। দ্রুত নকশা প্রণয়ন করে দরপত্রের মাধ্যমে স্থায়ীভাবে বাঁধ মেরামতের কাজ শুরু করা হবে।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপডেট সময় ০৮:২০:৪০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬
৫৫ বার পড়া হয়েছে

৩০ হাজার মানুষকে ঘরছাড়া করে শান্ত হলো খোয়াই নদী

আপডেট সময় ০৮:২০:৪০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬

খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের ছয় হাজার পরিবারের প্রায় ৩০ হাজার মানুষ ভিটেমাটি ছাড়ার পর ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ ও বাঁধ মেরামতে নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। অথচ কয়েক বছর ধরেই ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ নিয়ে স্থানীয়দের আতঙ্ক ছিল। সময়মতো ব্যবস্থা না নেওয়ার খেসারত হিসেবে এবার নেমে এসেছে মানবিক বিপর্যয়।

গতকাল শনিবার বিকেল পর্যন্ত পানি নামতে শুরু করায় আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা মানুষ ঘরে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ক্ষতিগ্রস্ত নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোর সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ—কোনোমতে আবার নিজের ভিটায় ফেরা।

এর আগে গত বৃহস্পতিবার রাতে কালীগঞ্জ এলাকায় বাঁধ ভেঙে পাহাড়ি ঢলের পানি লোকালয়ে ঢুকে পুরো ইউনিয়ন প্লাবিত হয়।হবিগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আবু জাহের বলেন, ২৫ গ্রামের ছয় হাজার পরিবারের ৩০ হাজার মানুষ বন্যাকবলিত হয়েছেন। কেউ ইউনিয়ন পরিষদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ইটভাটাসহ বিভিন্ন স্থাপনা প্লাবিত হয়েছে। এখন পানি নামছে। কৃষি, প্রাণিসম্পদ ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, পুরুষরা ঘরবাড়ি পরিষ্কার ও মালামাল রক্ষায় ব্যস্ত, আর নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছেন।

ইউনিয়ন পরিষদের বারান্দায় পক্ষাঘাতগ্রস্ত ছেলে আব্দুল আজিজকে নিয়ে আশ্রয় নেওয়া ৮০ বছরের সৈয়দা বানু বলেন, বাড়ির পানি পুরোপুরি নামেনি। স্বামী ঘর পরিষ্কার করছেন। দুই দিনে সরকারি কোনো সহায়তা পাননি; আত্মীয়ের পাঠানো খাবারেই দিন কেটেছে।

রিনা বেগম, আব্দুল হামিদ, আমীর আলীসহ ১০টি পরিবার ইউনিয়ন পরিষদে আশ্রয় নিয়েছে। তাঁদের ভাষ্য, ঘর থেকে কিছুই বের করতে পারেননি। প্রথম ২৪ ঘণ্টা রান্নার ব্যবস্থা না থাকায় শিশুদের খাওয়াতে পারেননি। পরে স্থানীয় এক বাড়িতে রান্না করে খাবারের ব্যবস্থা হয়। কান্নাজড়িত কণ্ঠে রিনা বেগম বলেন, “ছবি তুইল্যা কিতা করতায় রে ভাই। আমরার পেটে তো ভাত নাই। পারলে সরকাররে কইয়া সাহায্যের ব্যবস্থা কইরা দেও।”

শাহজালাল উচ্চবিদ্যালয়েও প্রায় ২০টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। রিকশাচালক নুরুল আমীনের দুই শিশুর শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত ভাত জোটেনি। ধার করে গ্যাস সিলিন্ডার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনে খাবারের ব্যবস্থা করেন। চুনারুঘাট ভূমি অফিসের কর্মচারী আমীর আলী বলেন, “বেতনের টাকায় সংসার চালাই। অন্তত পাঁচ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। কীভাবে সামাল দেব বুঝতে পারছি না।”

সরকারি হিসাব না হলেও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ধারণা, ঘরবাড়ি, ফসল ও মালামাল মিলিয়ে ক্ষতির পরিমাণ কয়েকশ কোটি টাকা।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যে দেখা যায়, ২০১৭ সালে খোয়াই নদীর পানি বিপৎসীমার ২৮২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে গেলেও বাঁধ ভাঙেনি। এবার ২২১ সেন্টিমিটারেই বাঁধ ভেঙেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অবাধে বালু ও মাটি উত্তোলনের কারণে নদীর ধারণক্ষমতা কমে যাওয়ায় আগের তুলনায় ৬১ সেন্টিমিটার কম পানিতেই এ বিপর্যয় ঘটেছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের হবিগঞ্জ শাখার সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী হারুন বলেন, বালু উত্তোলন ও বাঁধে অবৈধ বসতি নিয়ে বহুদিনের সতর্কতা উপেক্ষা করা হয়েছে। বালু উত্তোলন বন্ধ এবং বাঁধ শক্তিশালী করার তেমন কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান ছিল না। এবার তার ফল হিসেবে মানবিক বিপর্যয় ঘটেছে।
হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সায়েদুর রহমান বলেন, বাম তীরে ২১ কোটি টাকায় ২৩ কিলোমিটার বাঁধের কাজ চললেও ডান তীরের অংশটি দীর্ঘদিন সংস্কার করা হয়নি। এখন ব্লক সংগ্রহ করা হয়েছে। দ্রুত নকশা প্রণয়ন করে দরপত্রের মাধ্যমে স্থায়ীভাবে বাঁধ মেরামতের কাজ শুরু করা হবে।