ঢাকা ০৮:১১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo চুনারুঘাটে কালের আবর্তে হারিয়ে যাচ্ছে গরু দিয়ে জমি চাষ Logo চুনারুঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ৩২ পদের বিপরীতে আছেন মাত্র ১২ চিকিৎসক, Logo হবিগঞ্জে চুনারুঘাটে ৬১ কেজি গাঁজাসহ গ্রেপ্তার ৪ Logo ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে শায়েস্তাগঞ্জ পৌর যুবদলের ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প ও র‌্যালি অনুষ্ঠিত Logo সাবেক স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সৈয়দ গাজিউর রহমানের দাফন সম্পন্ন Logo নাব্য সংকটে সুতাং নদী এখন মরা খাল শিল্পবর্জ্যের দূষণে বিষাক্ত পানি Logo সৌদি আরবে প্রাইভেট কারের চাপায় শায়েস্তাগঞ্জের যুবক নিহত, পরিবারে মাতম Logo ‘অভাব তো বয়স বোঝে না, পেট তো খাবার চায়’ Logo আজমিরীগঞ্জে ২১ ঘণ্টা পর নদীতে ভাসল নিখোঁজ গৃহবধূর মরদেহ Logo শায়েস্তাগঞ্জে জয়ন্তিকা ট্রেনের ইঞ্জিনে আগুন, যাত্রীদের দুর্ভোগ

সাতছড়ির অরণ্যে অত্যন্ত বিরল ‘কালো মথুরা’

নিজস্ব প্রতিবেদক

হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের ঘন অরণ্যে আবারও দেখা মিলেছে দেশের অন্যতম বিরল বনজ পাখি কালো মথুরার। বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রী আনিস শেখ সম্প্রতি উদ্যানের গভীর বনে একটি পূর্ণবয়স্ক পুরুষ কালো মথুরার ছবি ধারণ করেছেন। দুর্লভ এই আলোকচিত্র প্রকাশের পর প্রকৃতিপ্রেমী, পাখি গবেষক ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণকর্মীদের মধ্যে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

বন বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, কালো মথুরা বাংলাদেশের অত্যন্ত বিরল আবাসিক বনমোরগ। ঘন চিরসবুজ ও আধা-চিরসবুজ বনই এদের প্রধান আবাসস্থল। মানুষের উপস্থিতি টের পেলেই পাখিটি দ্রুত ঝোপঝাড়ের আড়ালে লুকিয়ে পড়ে। ফলে প্রকৃতিতে এর দেখা পাওয়া যেমন কঠিন, তেমনি ক্যামেরাবন্দি করাও অত্যন্ত দুরূহ।

বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রী আনিস শেখ বলেন, দীর্ঘ সময় ধৈর্য ধরে বন পর্যবেক্ষণের পর সাতছড়ির একটি নিরিবিলি এলাকায় পাখিটির দেখা পান তিনি। তখন সেটি বনপথের পাশে খাবারের সন্ধানে ব্যস্ত ছিল। নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে কয়েকটি মুহূর্ত ক্যামেরায় ধারণ করতে সক্ষম হন।

তিনি বলেন, দেশের বনাঞ্চলে এমন বিরল প্রজাতির উপস্থিতি জীববৈচিত্র্যের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে। এই সম্পদ রক্ষায় বন সংরক্ষণ ও জনসচেতনতা আরও বাড়ানো জরুরি।

প্রকৃতিবিদেরা জানান, পুরুষ কালো মথুরার দেহ চকচকে নীলাভ-কালো পালকে আবৃত। মাথায় উজ্জ্বল লাল রঙের খোলা চামড়া এবং লম্বা সাদা-কালো মিশ্রিত লেজ এ পাখিটিকে সহজেই অন্য বনমোরগ থেকে আলাদা করে। বনজ ফল, বীজ, কচি পাতা ও ছোট পোকামাকড়ই এদের প্রধান খাদ্য।

প্রায় ২৪৩ হেক্টর আয়তনের সাতছড়া জাতীয় উদ্যান দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্যের আবাসস্থল। এখানে শতাধিক প্রজাতির পাখির পাশাপাশি উল্লুক, মুখপোড়া হনুমান, মায়া হরিণ, বনবিড়ালসহ নানা ধরনের স্তন্যপায়ী, সরীসৃপ ও উভচর প্রাণীর বসবাস রয়েছে।

বন বিশেষজ্ঞদের মতে, কালো মথুরার উপস্থিতি উদ্যানটির পরিবেশগত গুরুত্বকে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরেছে। তবে এই বিরল প্রজাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণকর্মীদের মতে, অবৈধভাবে গাছ কাটা, বনভূমিতে মানুষের অনুপ্রবেশ, শব্দদূষণ এবং প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংসের কারণে কালো মথুরাসহ অনেক বনজ পাখির সংখ্যা কমে যাচ্ছে। এ কারণে সংরক্ষিত বনাঞ্চলে নজরদারি বাড়ানো, দর্শনার্থীদের সচেতন করা এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ অক্ষুণ্ন রাখার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।

সাতছড়া বন্যপ্রাণী রেঞ্জ কর্মকর্তা মেহেদী মাসুদ বলেন, কালো মথুরার উপস্থিতি শুধু একটি বিরল আলোকচিত্রের ঘটনা নয়; এটি সাতছড়া জাতীয় উদ্যানের সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ। সাম্প্রতিক সময়ে উদ্যানের জীববৈচিত্র্য আগের তুলনায় আরও সমৃদ্ধ হয়েছে। বিরল প্রজাতির এমন উপস্থিতি বন সংরক্ষণ কার্যক্রমের ইতিবাচক ফলও তুলে ধরে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) হবিগঞ্জ জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল সোহেল বলেন, সাতছড়ির মতো সংরক্ষিত বনাঞ্চলে বিরল বন্যপ্রাণীর নিরাপদ বিচরণ নিশ্চিত করা গেলে দেশের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ আরও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে এ ধরনের আলোকচিত্র ভবিষ্যতের গবেষণা, বন্যপ্রাণী পর্যবেক্ষণ এবং সংরক্ষণ কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে কাজ করবে।

দীর্ঘদিন ধরে সাতছড়া জাতীয় উদ্যান বিরল প্রাণী ও পাখির নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে পরিচিত। কালো মথুরার সাম্প্রতিক উপস্থিতি সেই সমৃদ্ধ অরণ্যের আরেকটি নীরব বার্তা—প্রকৃতি এখনো তার অমূল্য সম্পদ ধরে রেখেছে, প্রয়োজন শুধু সেই সম্পদ রক্ষায় আরও দায়িত্বশীল উদ্যোগ।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপডেট সময় ০৩:১২:১৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬
৬২ বার পড়া হয়েছে

সাতছড়ির অরণ্যে অত্যন্ত বিরল ‘কালো মথুরা’

আপডেট সময় ০৩:১২:১৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬

হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের ঘন অরণ্যে আবারও দেখা মিলেছে দেশের অন্যতম বিরল বনজ পাখি কালো মথুরার। বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রী আনিস শেখ সম্প্রতি উদ্যানের গভীর বনে একটি পূর্ণবয়স্ক পুরুষ কালো মথুরার ছবি ধারণ করেছেন। দুর্লভ এই আলোকচিত্র প্রকাশের পর প্রকৃতিপ্রেমী, পাখি গবেষক ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণকর্মীদের মধ্যে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

বন বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, কালো মথুরা বাংলাদেশের অত্যন্ত বিরল আবাসিক বনমোরগ। ঘন চিরসবুজ ও আধা-চিরসবুজ বনই এদের প্রধান আবাসস্থল। মানুষের উপস্থিতি টের পেলেই পাখিটি দ্রুত ঝোপঝাড়ের আড়ালে লুকিয়ে পড়ে। ফলে প্রকৃতিতে এর দেখা পাওয়া যেমন কঠিন, তেমনি ক্যামেরাবন্দি করাও অত্যন্ত দুরূহ।

বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রী আনিস শেখ বলেন, দীর্ঘ সময় ধৈর্য ধরে বন পর্যবেক্ষণের পর সাতছড়ির একটি নিরিবিলি এলাকায় পাখিটির দেখা পান তিনি। তখন সেটি বনপথের পাশে খাবারের সন্ধানে ব্যস্ত ছিল। নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে কয়েকটি মুহূর্ত ক্যামেরায় ধারণ করতে সক্ষম হন।

তিনি বলেন, দেশের বনাঞ্চলে এমন বিরল প্রজাতির উপস্থিতি জীববৈচিত্র্যের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে। এই সম্পদ রক্ষায় বন সংরক্ষণ ও জনসচেতনতা আরও বাড়ানো জরুরি।

প্রকৃতিবিদেরা জানান, পুরুষ কালো মথুরার দেহ চকচকে নীলাভ-কালো পালকে আবৃত। মাথায় উজ্জ্বল লাল রঙের খোলা চামড়া এবং লম্বা সাদা-কালো মিশ্রিত লেজ এ পাখিটিকে সহজেই অন্য বনমোরগ থেকে আলাদা করে। বনজ ফল, বীজ, কচি পাতা ও ছোট পোকামাকড়ই এদের প্রধান খাদ্য।

প্রায় ২৪৩ হেক্টর আয়তনের সাতছড়া জাতীয় উদ্যান দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্যের আবাসস্থল। এখানে শতাধিক প্রজাতির পাখির পাশাপাশি উল্লুক, মুখপোড়া হনুমান, মায়া হরিণ, বনবিড়ালসহ নানা ধরনের স্তন্যপায়ী, সরীসৃপ ও উভচর প্রাণীর বসবাস রয়েছে।

বন বিশেষজ্ঞদের মতে, কালো মথুরার উপস্থিতি উদ্যানটির পরিবেশগত গুরুত্বকে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরেছে। তবে এই বিরল প্রজাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণকর্মীদের মতে, অবৈধভাবে গাছ কাটা, বনভূমিতে মানুষের অনুপ্রবেশ, শব্দদূষণ এবং প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংসের কারণে কালো মথুরাসহ অনেক বনজ পাখির সংখ্যা কমে যাচ্ছে। এ কারণে সংরক্ষিত বনাঞ্চলে নজরদারি বাড়ানো, দর্শনার্থীদের সচেতন করা এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ অক্ষুণ্ন রাখার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।

সাতছড়া বন্যপ্রাণী রেঞ্জ কর্মকর্তা মেহেদী মাসুদ বলেন, কালো মথুরার উপস্থিতি শুধু একটি বিরল আলোকচিত্রের ঘটনা নয়; এটি সাতছড়া জাতীয় উদ্যানের সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ। সাম্প্রতিক সময়ে উদ্যানের জীববৈচিত্র্য আগের তুলনায় আরও সমৃদ্ধ হয়েছে। বিরল প্রজাতির এমন উপস্থিতি বন সংরক্ষণ কার্যক্রমের ইতিবাচক ফলও তুলে ধরে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) হবিগঞ্জ জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল সোহেল বলেন, সাতছড়ির মতো সংরক্ষিত বনাঞ্চলে বিরল বন্যপ্রাণীর নিরাপদ বিচরণ নিশ্চিত করা গেলে দেশের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ আরও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে এ ধরনের আলোকচিত্র ভবিষ্যতের গবেষণা, বন্যপ্রাণী পর্যবেক্ষণ এবং সংরক্ষণ কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে কাজ করবে।

দীর্ঘদিন ধরে সাতছড়া জাতীয় উদ্যান বিরল প্রাণী ও পাখির নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে পরিচিত। কালো মথুরার সাম্প্রতিক উপস্থিতি সেই সমৃদ্ধ অরণ্যের আরেকটি নীরব বার্তা—প্রকৃতি এখনো তার অমূল্য সম্পদ ধরে রেখেছে, প্রয়োজন শুধু সেই সম্পদ রক্ষায় আরও দায়িত্বশীল উদ্যোগ।