শায়েস্তাগঞ্জে আগস্টের বিজয়
হবিগঞ্জ জেলার সবচেয়ে ছোট উপজেলা শায়েস্তাগঞ্জ। আয়তনে ছোট হলেও ইতিহাস, রাজনীতি ও আন্দোলন-সংগ্রামের নানা ঘটনায় এ জনপদের রয়েছে আলাদা পরিচয়। উপজেলার প্রাণকেন্দ্র দাউদনগর বাজার পয়েন্ট। ২০২৪ সালের আগস্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে এই জনপদও পরিণত হয়েছিল আন্দোলন-প্রতিরোধের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে।
৪ আগস্ট দুপুর। দাউদনগর বাজার পয়েন্টে জড়ো হতে থাকেন বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদল ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মী ও ছাত্র-জনতা। পৌর যুবদলের আহবায়ক প্রভাষক কামরুল হাসান রিপন, উপজেলা ছাত্রদলের সভাপতি শামসুল আলম রিপন, পিএনপি নেতা শফি কাইয়ুম, সবুজ মিয়া, ইমান উদ্দিন, আজিজুর রহমান মিমূল, মোয়াজ আহমেদ, ইশতিয়াক হোসেন মুন্না, আব্দুল্লাহ জুনায়েদ, আলাউদ্দিন আহমেদ, এনামুল হক আকাশ, ইবাদ মাহমুদ, এসএম সাব্বির, গালিব নূর আনাম, সাইদুল ইসলাম জয়, মোঃ কিবরিয়া রতন, মোঃ নাজমুল ইসলাম, খাইরুল ইসলাম বোরহান, এনাম শাহ মাহী, ফারদিন ইসলাম রিফাত, ইকবাল হোসেন সায়েম, আব্দুল মান্নান বকুল, নওশাদ হোসেন বাপ্পি, শাহীন আলম সুমন, মোঃ রাজু মিয়া, সাজ্জাদুর রহমান শাওন, রাহেল তালুকদার, রানা মিয়া, রিমন মিয়া, সজল আলী, রিফাতসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের নেতৃত্বে সেখানে একটি বড় মিছিল বের হয়। তারা ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে নানা স্লোগান দিয়ে মিছিল করছিল। এভাবে বেশ কিছু সময় অতিবাহিত হয়।উত্তাল স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে দাউদনগর বাজার পয়েন্ট। কিন্তু মিছিলের আড়ালে তখন অন্য এক পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছিল-এমনটাই দাবি করেন আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ফ্যাসিস্ট আওয়ামীলীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা গোপনে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। আন্দোলনকারীদের একটি অংশ বিষয়টি আঁচ করতে না পারলেও কিছুক্ষণ পর শায়েস্তাগঞ্জ রেলওয়ে পার্কিং এলাকা থেকে আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে পাথর নিক্ষেপ শুরু হয়।
এরপর পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পাথর নিক্ষেপের পাশাপাশি দেশীয় অস্ত্র নিয়েও হামলা চালানোর অভিযোগ ওঠে। একের পর এক হামলায় ছাত্র-জনতা, বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের অনেকে আহত হন। আহতের সংখ্যা শতাধিক ছাড়িয়ে যায় ।
হামলার তীব্রতা বাড়তে থাকলেও আন্দোলনকারীরা একপর্যায়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। একই সঙ্গে আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। দিনভর সংঘর্ষ ও উত্তেজনার পরও পরিস্থিতি থামেনি। রাতে আন্দোলনকারী ও ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল বলেও অভিযোগ ওঠে।
পরদিন ৫ আগস্ট সকাল থেকেই শায়েস্তাগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি বিরাজ করতে থাকে। একদিকে ফ্যাসিস্ট আওয়ামীলীগ ও তাদের সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের তৎপরতার অভিযোগ, অন্যদিকে বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদল এবং ছাত্র-জনতার বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান-সব মিলিয়ে শায়েস্তাগঞ্জ যেন অপেক্ষা করছিল একটি বড় পরিবর্তনের।সকাল গড়িয়ে দুপুর, দুপুর পেরিয়ে বিকেল। এরই মধ্যে আসে সেই বহুল প্রতীক্ষিত খবর-তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন।
খবর ছড়িয়ে পড়তেই শায়েস্তাগঞ্জে শুরু হয় বিজয় উল্লাস। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদল নেতাকর্মীসহ ছাত্র-জনতার মিছিল ও স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে জনপদ।‘ফ্যাসিস্ট হাসিনা পালিয়ে গেছে’ এমন স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে শায়েস্তাগঞ্জের রাজপথ। এ সময় আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীদের অনেকেই আত্মগোপনে চলে যান বা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যান।
৪ আগস্টের ঘটনার আগেও বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের ওপর একাধিকবার হামলা এবং মামলা দেওয়ার অভিযোগ ছিল বলে দাবি করা হয়। এসব মামলায় পৌর বিএনপির সভাপতি ও সাবেক মেয়র এমএফ আহমেদ অলিসহ দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে তারা কারাগার থেকে মুক্তি পান বলে লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে।
৪ আগস্টের হামলার ঘটনায় পরবর্তীতে শায়েস্তাগঞ্জ থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। মামলার বাদী শেখ হৃদয় ওরফে আতাউর রহমান হৃদয়ের অভিযোগ, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে শায়েস্তাগঞ্জ রেলওয়ে পার্কিং এলাকায় হামলার সময় তার চোখ ও মুখে পাথরের আঘাত লাগে। এতে তিনি গুরুতর আহত হন।
আহত অবস্থায় প্রথমে তাকে হবিগঞ্জ সদর আধুনিক হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে মৌলভীবাজারেও চিকিৎসা নেন তিনি। কিন্তু শারীরিক অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) ভর্তি করা হয় বলে মামলার বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে।
১৭ সেপ্টেম্বর শায়েস্তাগঞ্জ থানায় দায়ের করা ওই মামলায় ১১৫ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও দেড় থেকে দুইশ জনকে আসামি করা হয়।৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বিজয় এলেও শায়েস্তাগঞ্জে রাজনৈতিক উত্তেজনা পুরোপুরি থেমে যায়নি-এমন দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের অভিযোগ, এরপরও গোপনে নানা ধরনের ষড়যন্ত্র ও হামলার ঘটনা ঘটতে থাকে।
এরই ধারাবাহিকতায় ২১ অক্টোবর বিকেলে শায়েস্তাগঞ্জ জংশন এলাকায় ছাত্রদল কর্মী নুরে আলম স্বাধীনের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ করা হয়। এ ঘটনায় ২২ অক্টোবর শায়েস্তাগঞ্জ থানায় মামলা করেন আহত স্বাধীনের বাবা হবিগঞ্জ সদর উপজেলার বাগুনীপাড়া গ্রামের মো. শাহজাহান মিয়া।
মামলায় ৩৪ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও ৮ থেকে ১০ জনকে আসামি করা হয়।নুরে আলম স্বাধীন জানান, তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। এর জেরে ২১ অক্টোবর বিকেলে তাকে একা পেয়ে শায়েস্তাগঞ্জ পৌরসভার তালুগড়াই গ্রামের আনোয়ার হোসেন, তার ছেলে ও পৌর ছাত্রলীগের তৎকালীন যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক সারোয়ার হোসেন এ্যানিসহ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা হামলা চালান বলে তার অভিযোগ। এতে তিনি আহত হন।শায়েস্তাগঞ্জের আগস্ট তাই শুধু একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের গল্প নয়-এটি আন্দোলন, হামলা, আহত হওয়া, মামলা, প্রতিরোধ এবং শেষ পর্যন্ত বিজয়ের স্মৃতিও বহন করে।
৪ আগস্টের উত্তাল রাজপথ থেকে ৫ আগস্টের বিজয় উল্লাস-মাত্র এক দিনের ব্যবধানে শায়েস্তাগঞ্জ দেখেছে ইতিহাস এক যারা সেদিন রাজপথে ছিলেন, তাদের কাছে আগস্টের সেই দিনগুলো আজও শুধুই স্মৃতি নয়; বরং আন্দোলনের উত্তাপ, আতঙ্ক, আহত মানুষের আর্তনাদ এবং বিজয়ের উল্লাস মিলেমিশে থাকা এক জীবন্ত অধ্যায়।শায়েস্তাগঞ্জের মানুষ সেই অধ্যায়কে কীভাবে মনে রাখবে, ইতিহাসই হয়তো তার চূড়ান্ত উত্তর দেবে। তবে ৪ ও ৫ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ এ জনপদের রাজনৈতিক ইতিহাসে দীর্ঘদিন আলোচিত হয়ে থাকবে-এ কথা বলাই যায়।














